ক্ষণিকের সুখ
দেবাঞ্জনের সঙ্গে মিথিলার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন বয়সে মিথিলা ছিল অনেক ছোট। দেবাঞ্জন একজন সুন্দর সুপুরুষ, বড় ব্যবসায়ী, গাড়ি,বাড়ি, ঝি,চাকর টাকা পয়সা কোন কিছুরই অভাব ছিল না। শুধু অভাব ছিল একজন প্রকৃত ভালোবাসার মানুষের।
ছোটবেলাতেই বাবা-মা মারা যাওয়াতে তাদের ইচ্ছা এবং উইল অনুযায়ী দেবাঞ্জন দার্জিলিংয়ের খুব বড় এক হোস্টেল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে। পরে ১৮ বছর বয়স হলে কলকাতায় ফিরে আসে।
উইলের শর্ত অনুযায়ী যে উকিলকে তার অভিভাবক হিসেবে রাখা হয়েছিল তিনি ছিলেন দেবাঞ্জনের বাবার পরিচিত। বলা ভালো খুব ভালো বন্ধু। তিনি তার সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে তার বন্ধুর কাছে তার ছেলের সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করে গেছিলেন কারণ আকস্মিকভাবে দেবাঞ্জনের বাবা মার মৃত্যু ঘটে, তারা স্বামী স্ত্রী দু'জনেই রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন সময়ে দেবাঞ্জনের বাবার বন্ধু তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে দেখাশোনা করছিলেন আর তখনই দেবাঞ্জনের বাবা বন্ধুকে তার মনের কথাগুলো জানান ও একটি উইল করতে বলেন।
একজন মৃত্যু পথযাত্রী বন্ধুর বিশ্বাসের সম্পূর্ণ মর্যাদা রেখে দেবাঞ্জনের বাবার উকিল বন্ধু অর্পণ চৌধুরী উইলটি করেন এবং হাসপাতাল চত্বরেই কোর্ট অর্ডার এনে উইলে সইসাবুদ করান। এই ঘটনার দিন সাতেক পরে দেবাঞ্জনের বাবা মারা যান। দেবাঞ্জনের মা এক্সিডেন্টের সাথে সাথে সেখানেই মারা গেছিলেন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ হয়েছিল না।
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মেধাবী দেবাঞ্জন কলকাতায় ফিরে এলে উইলের শর্ত অনুযায়ী অর্পণ চৌধুরী তাকে খড়গপুর আইআইটিতে ভর্তি করেন। নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে একটার পর একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সে বাবার এই বিশাল সম্পত্তির প্রকৃত মালিক হয়ে ওঠে।
অর্পণ চৌধুরী দেবাঞ্জনকে বাবার মত গাইড করেন এবং প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করেন। দেবাঞ্জন অর্পণ চৌধুরীর এই পরিশ্রম বৃথা হতে দেয়নি।
সারা জীবন আত্মীয়-স্বজন বর্জিত দেবাঞ্জনের স্কুল কলেজ লাইফে কিছু বন্ধুবান্ধব থাকলেও সময়ের সাথে সাথে তারা এদিক ওদিকে ছিটকে গেছে। দেবাঞ্জন সারা জীবনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় জীবন পাড়ি দিচ্ছে কিছু মাস মাইনে ঝি চাকরের সেবাযত্ন নিয়ে।
দেবাঞ্জনের বয়স যখন ৩৮ বছর তখন সে ব্যবসার কাজে ব্যাঙ্গালোর যায়। দেবাঞ্জন হোটেলের যে রুমটিতে ছিল তার পাশের রুমে ছিল মিথিলা এবং তার অসুস্থ মা। কলকাতা থেকে মিথিলা তার মাকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর সুচিকিৎসার জন্য গেছিল। পাশাপাশি রুমে থাকার ফলে দুই এক সময় তাদের চোখাচোখি হয়। মিথিলার বয়স তখন ২২ বছর।
এই অল্প বয়সী মেয়েটি একাকী তার মাকে নিয়ে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর চিকিৎসা করতে গিয়ে জানতে পারে তার মায়ের একটি অপারেশন করতে হবে। ভীষণ ভেঙে পড়ে মিথিলা। পাশাপাশি রুমে থাকার ফলে মিথিলার সাথে দেবাঞ্জনের যে টুকটাক কথা হয় তার ওপর ভিত্তি করে মিথিলা দেবাঞ্জনকে অনুরোধ করে তার মায়ের অপারেশনের দিন তার সাথে থাকার জন্য। দেবাঞ্জনের ব্যবসার কাজ তখন শেষ হয়ে গেছে। সে ফিরে আসার তোড়জোড় করছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মিথিলা তার রুমে ঢুকে এই অনুরোধ তাকে জানায়। প্লেনের টিকিট কাটা, ব্যাগ গোছানো রেডি। কিন্তু কিছুতেই সে মিথিলার মুখের উপর কেন জানি না বলতে পারে না।
সেদিন সন্ধ্যায় গিয়ে মিথিলার সাথে তার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসে। তার ঠিক পরদিন সকালবেলা তার মায়ের অপারেশনের জন্য মিথিলার সাথেই হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য অপারেশনের পর মিথিলার মায়ের আর জ্ঞান ফিরে আসে না। মিথিলার এই চরম দুর্দিনে দেবাঞ্জন মিথিলার মত নিয়ে তার মায়ের সেখানেই সৎকার করে মিথিলার কথামতো।
মিথিলা আলাপচারিতায় দেবাঞ্জনকে জানিয়েছিল এই পৃথিবীতে তার মা ছাড়া আর কেউ নেই। তাই যেভাবেই হোক মাকে বাঁচাতে হবে। দেবাঞ্জন অর্থ এবং পরিশ্রম দিয়ে একটা অপরিচিত মেয়ের উপকার করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিধাতা দেবাঞ্জন ও মিথিলার কপালে অন্য কিছু লিখেছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মিথিলাকে একা করে দিয়ে তার মা চিরতরে চলে যান। হয়তো বিধাতাই দেবাঞ্জনকে মিথিলার জন্যই সেখানে উপস্থিত করেছিলেন।। মিথিলাকে ফেলে দেবাঞ্জন একা ফিরে আসতে পারে না। এই ক'টাদিনে মিথিলার প্রতি অদ্ভুত একটা মায়া কাজ করতে থাকে তার মনে। মিথিলা প্রথম অবস্থায় রাজি না হলেও পরে সে দেবাঞ্জনের সাথেই কলকাতায় ফিরে আসে। দেবাঞ্জন তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়।কিন্তু দু'দিন পরেই দেবাঞ্জন আবার মিথিলার সাথে দেখা করতে যায়।
একাকী একটা মেয়ে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় ভাড়াবাড়িতে থাকা যে কতটা দুষ্কর তারপর অর্থকরী সমস্যা তো আছেই।বাবার জমানো যেটুকু টাকা ছিল মায়ের চিকিৎসার জন্য সব খরচ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় মেয়েটার প্রতি যে মায়া কিংবা যে দুর্বলতা দেবাঞ্জনের মনে হয়েছে তার থেকে দেবাঞ্জন বেরোতে পারেনি। তাই মিথিলার মায়ের মৃত্যুর তিন মাস পরেই দেবাঞ্জন মিথিলাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে।
মিথিলা স্বপ্নেরও অতীত ছিল তার এই ভাগ্য পরিবর্তনের। কিন্তু সত্যিই সেটা ঘটেছে। দেবাঞ্জনের মত একটা সুপুরুষের হৃদয়মথিত করা ভালোবাসা পেয়ে মিথিলা তার জীবনে ভীষণ সুখী। হ্যাঁ দেবাঞ্জনের বয়স হয়তো একটু বেশি। কিন্তু তার জন্য মিথিলার প্রতি ভালোবাসার কোন কমতি নেই।
প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে দেবাঞ্জন মিথিলাকে একটা হীরের সেট ছাড়াও উপহার দেয় একটা বটের বনসাই। উপহারটা পেয়ে মিথিলা তার কাছে জানতে চায়,
-- এটা দেওয়ার অর্থ কি?
দেবাঞ্জন তাকে জানায় সে যখন থাকবে না এই বনসাই তার ডালপালা, শিকড় বিস্তার করে নিজেকেই নিজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকবে। ঠিক তার এই সংসারের মত।এইভাবে এই বনসাই এর মধ্যেই সারা জীবন মিথিলার সাথে সে থাকতে পারবে।
দু'বছরের মধ্যে মিথিলা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়।
জীবনের উপর দিয়ে কয়েক যুগ পার হয়ে গেছে। দেবাঞ্জন দু'বছর আগে তার মিথিলাকে ছেড়ে চলে গেছে। ছেলে এখন তার উপযুক্ত। সে তার বাবার ব্যবসা ঠিক বাবার মতই আগলে রেখেছে। আর আগলে রেখেছে তার মাকে। মিথিলা বনসাইটাকে ড্রয়িং রুম থেকে এনে তার বেডরুমে নিয়ে এসেছে। বনসাইটা সত্যিই তার ডালপালা শিকড় বিস্তার করে নিজেকেই নিজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে।
মিথিলা ছেলের বিয়ে দিয়েছে। তার একছেলে আর এক মেয়ে। সংসার বড় হওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে দেবাঞ্জনের এনে দেওয়া বনসাইটাও যেন বেড়ে চলেছে।
মিথিলার মনে হয় এই বনসাই এর মধ্য দিয়ে দেবাঞ্জন ঠিক সেই আগের মতই তাকে সকল ঝড়ঝাপটা থেকে রক্ষা করে চলেছে।
মানবী ২১-২-২৬
No comments:
Post a Comment