না পাওয়ার প্রেম কথা
প্রায় পনেরো বছর পর কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আগে প্রায়ই হাঁটতাম । সাথে থাকতো কৌশিক। এতদিন পরে কৌশিকের খোঁজে আবার কলেজ স্ট্রীট আসলাম। আজ কৌশিক আমার সাথে নেই। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই কেন জানি না আমার মনে হয় কৌশিক সব সময়ের জন্য আমার সাথে আছে। এই যে ১৫ বছর জীবন থেকে কেটে গেছে একটা মুহূর্তের জন্যও কৌশিক আমার মন থেকে কোথাও যায়নি। এক সময় মনে হতো কৌশিককে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। কিন্তু কৌশিককে ছাড়া দিব্যি বেঁচে আছে, হাসি আনন্দে লোক দেখানো সুখে আছি। কিন্তু সত্যিই কি আমি সুখে আছি? কৌশিক যে সব সময় আমার সাথে আছে যা আমি ছাড়া কেউ দেখতে পারে না কেউ বুঝতে পারে না। কেউ কোনদিন বুঝতেও পারবে না।
আজ যে রাস্তাটা দিয়ে হাঁটছি, এই রাস্তাটাও কৌশিকই আমাকে চিনিয়েছে ওর দোকানে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা। কলেজ স্ট্রিটের অলিগলি সবকিছু কৌশিক আমাকে দেখিয়ে চিনিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ এতগুলো বছর বাদে কৌশিক আমায় দেখে চিনতে পারবে তো? অবশ্য আমিও কী কৌশিককে দেখে এক নজরেই চিনতে পারবো?
সেই কবেকার কথা। কলেজের সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটি একদম ভ্যালেন্টাইন্স'ডে তে একগুচ্ছ লাল গোলাপ হাতে নিয়ে একটা নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। যারা দেখতে পেয়েছিল তারা সবাই খুব হাসাহাসি করছিল। কিন্তু ও ছিল নির্লিপ্ত। ওটা ছিল আমার যাতায়াতের রাস্তা। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কৌশিক আমার প্রতীক্ষায় ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যখন বাড়ি যাব বলে ওই রাস্তা ধরলাম তখন ক্লাসমেটরা আমাকে বলল, " ও পথে যাস না ও পথে গেলে আজ তুই বিপদে পড়বি। আমি তখন ওদের কথার মানে বুঝিনি। আমি রাস্তা দিয়ে যখন কৌশিককে ক্রস করে এগিয়ে যাচ্ছি কৌশিক পিছন থেকে আমায় ডাক দেয়। ঘুরে দাঁড়িয়ে বলি,
--আমায় কিছু বলবে?
তুমি করে কথা বলতাম কারণ কৌশিক আমার থেকে এক বছরের সিনিয়র ছিল।
-- বলবো বলেই তো সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছি।
কৌশিকের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-- বল কি বলবে?
কৌশিক একটুও ভূমিকা না করে পিছনে লুকিয়ে রাখা লাল গোলাপের গুচ্ছটা আমার সামনে ধরে বলল, ---আজকের দিনে এই ফুলগুলো দেওয়ার অর্থটা তুমি বোঝো তো? যদি তুমি বোঝো আর যদি আমার কথায় রাজি থাকো তাহলে এগুলো তুমি নাও। আমি আমার মনের কথাটা এভাবেই তোমাকে জানালাম।
কৌশিকের জন্য আমার মনের মধ্যে পূর্ব থেকেই একটু দুর্বলতা ছিল। কিন্তু কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি কলেজের সবথেকে সুন্দর দেখতে ছেলেটা যে কিনা অধিকাংশ মেয়েদের হার্টথ্রব সে আমায় প্রপোজ করবে। আমি হেসে পড়ে কৌশিকের হাত থেকে গোলাপের গুচ্ছটা নিয়ে একটু দ্রুত বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।
তারপর থেকে সময় যে কোথা দিয়ে গড়িয়ে যেত টেরই পেতাম না। কলেজ শেষ হলো কৌশিক চাকরি যোগাড় করতে না পেরে কলেজস্ট্রিট একটি বইয়ের দোকান দিলো।আমারও কলেজ শেষ হলো আমি ছোটখাটো একটা চাকরি পেলাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে আমরা দু'জনেই বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।কারণ আমরা দু'জনেই ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আর সেই কারণেই চেয়েছিলাম দুজনেই কিছু অর্থ জোগাড় করে মা,বাবার কষ্ট করে জমানো অর্থ খরচ না করে নিজেদেরকে স্বাবলম্বী করে তারপর বিয়েটা করবো। এই দেরি করাটাই মনেহয় কাল হল।
আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম সেই কোম্পানির মালিক আমায় পছন্দ করলেন তার একমাত্র ছেলের জন্য। তিনি আমায় কিছু না জানিয়ে সরাসরি এসে আমার বাবাকে তাঁর ছেলের সাথে আমার বিয়ের কথা বললেন। বাবা আমায় জিজ্ঞাসা না করেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেললেন ওই দিনেই ; যেদিন মালিক এসে তার ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি অফিস থেকে ফিরে বাবার কাছে সব জানি। আমি আমার অপারগতা জানাই।আমি যে অন্য কাউকে ভালবাসি তাকে বিয়ে করতে চাই সে কথাও বলি। কিন্তু আমার কোন কথাই মা,বাবা কর্ণপাত করেন না।
আমি পরদিন অফিসের নাম করে বেরিয়ে কৌশিকের দোকানে যাই। তাকে সব জানাই। আমি যখন কৌশিককে সব বলতে থাকি তখন কৌশিক চুপচাপ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আমার কথা শেষ হওয়ার পরে আমি বুঝতে পারি কৌশিক জোর করে মুখে হাসি এনে বলে,
--বাহ এতো খুব ভালো খবর। এই কথাটা বলতে এত দুঃখী দুঃখী মুখ করে আছো কেন? আমি ভাবলাম কি না কি হয়ে গেছে!
আমি অবাক হয়ে কৌশিককে বললাম,
-- কি বলছ তুমি?আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তুমি কি আমার কথাটা বুঝতে পারোনি?
কৌশিক তখন খুব আস্তে করে আমায় বলল,
-- দেখো কাউকে ভালবাসলে তার সুখটাই বড় সুখ এই যে তুমি বললে না কোম্পানির মালিকের ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হবে, বিয়ের পর তুমি লন্ডন চলে যাবে- এটা শুনে আমার ভালোবাসার সমস্ত কষ্ট লাঘব হয়ে গেছে। কারণ তুমি সুখী হলেই আমি ভালো থাকবো। তুমি অমত করো না। আর যেখানে মেসোমশাই কথা দিয়ে দিয়েছেন তুমি তাঁর কথা না শুনলে তাঁর সম্মানহানি হবে শুধু তাই নয় যে কোন অঘটনও তিনি ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। সুতরাং আমার মনে হয় তোমার বিয়েতে রাজি হয়ে যাওয়া ভালো।
কৌশিকের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। চোখ থেকে অনর্গল ধারায় জল পড়ে যেতে লাগলো।কৌশিক চুপচাপ তার চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রতিদিনের মতো দোকান থেকে দু'কাপ চা নিয়ে এলো।ইচ্ছে করছিল না খেতে। কৌশিকের বারবার অনুরোধে খেলাম। জানি না সেদিন আমার কি হয়েছিল। কৌশিকের এই নির্লিপ্ত ভাব আমার ভালো লাগেনি। ফিরে এলাম কৌশিকের কাছ থেকে চির জীবনের মত।
কৌশিকের দোকানের সামনে এসে দেখলাম দোকানটার আরো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পাশে আর একটা দোকান নিয়ে নিজের দোকানটাকে বড় করেছে আস্তে আস্তে দোকানের ভিতর গিয়ে ঢুকলাম।
কৌশিক যে চেয়ারটায় বসে থাকতো সেই চেয়ারটাই আজ অন্য একটি ছেলে বসা। ছেলেটিকে আমি চিনি না। অল্প বয়স এই বাইশ কী চব্বিস বছর হবে। ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে জানতে চাইলো,
-- বলুন কি বই চাই? আমি সরাসরি ওকে জিজ্ঞেস করলাম কৌশিক চৌধুরী আছেন?
ছেলেটি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দোকানের ফাঁকা একটা দেওয়ালের দিকে তর্জনী তুলে কৌশিকের বড় করে বাঁধানো ছবিটা দেখায় যে ছবিতে একটা প্লাস্টিক রজনীগন্ধার মালা দেওয়া।
আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম। ছেলেটি উঠে আমায় ধরে একটা টুলের উপর বসিয়ে দিল। সামনে রাখা এক গ্লাস জল এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। জলটা খেতে গিয়ে চোখের জল গ্লাসের ভিতর টপটপ করে পড়ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ছেলেটির কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি আজ থেকে বছর দশেক আগে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে কৌশিক বাইক এক্সিডেন্ট করে মারা যায়। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তিনদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হেরে যায়।এই ছেলেটি ওর কাকার ছেলে। কৌশিক মারা যাওয়ার আগে বলে যায় ও যদি মারা যায় তাহলে এই দোকানটা যেন ওর এই ভাইকে দিয়ে দেওয়া হয়। কৌশিকের মা ছেলের এই মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে ছ'মাসের মাথায় তিনিও মারা যান।
কতক্ষণ দোকানে বসেছিলাম আজ আর মনে নেই। তবে একটা কথা আমি উপলব্ধি করলাম এই এতগুলো বছর কৌশিক আমার জীবনে না থেকেও আমার সাথে সাথে থাকাটা মনে হওয়াকে আমি যেন আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম।
#মানবী ১৬-২-২৬
No comments:
Post a Comment