Monday, January 16, 2023

একদিন ভালোবাসবে (তৃতীয় পর্ব)

একদিন ভালোবাসবে ( তৃতীয় পর্ব)


  সেদিন কলেজ পিকনিকে বিকেল বেলায় চা,টিফিন হয়ে যাওয়ার পর সবাই গিয়ে বাসের ভিতর উঠে বসলো। শ্রাবণীর গায়ে নিলয়ের জ্যাকেটটা দেখে কেউ টেরিয়ে দেখলো আবার কেউ বা সরাসরিই জানতে চাইলো ব্যাপারটা কত দুর গড়িয়েছে? কিন্তু শ্রাবণী কিংবা তার সাথে থাকা বন্ধুটি একদম মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে।একই সাথে নিলয়রাও। নিলয় ও শ্রাবণী একই সাথে বাসে উঠে আর উঠেই শ্রাবণী জানলার দিকের একটি ছিট দখল করার সাথে সাথেই টুক করে নিলয় তার পাশে বসে পড়ে। কেউ একটু আড় চোখে দেখলো আবার কেউবা একটু হাসলো। শুরু করলো নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন।বাসটা কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর নিলয় মুখ নিচু করে খুব আস্তে দুরুদুরু বুক নিয়ে শ্রাবণীর কাছে জানতে চাইলো,
--- কী বলবি বলেছিলি?
 শ্রাবণী নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
--- হ্যাঁ বলছি,আমার বাবা ভীষণ রাগী মানুষ। এই জ্যাকেটটা পরে আমি যদি বাড়ি ফিরি তাহলে আমার বাইরে বেরোনো এমনকি পড়াশুনায় হয়ত বন্ধ করে দেবেন।কিন্তু জ্যাকেট ছাড়া রাস্তা থেকে বাড়িতে যাওয়ায় মুস্কিল।এদিকে আমার জামাটা কিছুটা ছিঁড়ে গেছে উপরন্তু ওড়নাটাও নেই।এভাবে বাড়ি ঢুকলে বাবা আমায় আস্ত রাখবেন না।আমি একটা ওড়না কিনবো।তুই আমার সাথে একটু দোকানে যাবি। ওড়নাটা কিনে তোর জ্যাকেটটা দিয়ে দেবো।
 নিলয়ের এতক্ষণ পরে বুকের ধুকপুকানি বন্ধ হল।মনেমনে একটু হেসেও নিলো।তারপর বললো,
--- ওকে কোন সমস্যা নেই।
 দু'জনে একসাথে বাস থেকে নেমে একটা দোকান থেকে ওড়না কিনে একটু ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে শ্রাবণী তার গায়ের থেকে জ্যাকেটটা খুলে ওড়নাটাকে গায়ে চাপিয়ে জ্যাকেটটা নিলয়ের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল,
-- যেখানেই থাকি না কেন আজকে তোর এই উপকারের কথা জীবনেও ভুলবো না।
 নিলয় এ কথা শুনে একটু মুচকি হেসে দিয়ে বললো,
--- সাবধানে যাস।
  বাড়ি ফেরার পথে নিলয় সেদিন সারাটা রাস্তা নিজের মনেই হেসেছে। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেকেই দোষারোপ করেছে।

      নিলয় সেই সন্ধ্যায় বেরিয়েছে তারপর বাবা,মা মিলে তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছেন প্রতিবারই সে একই উত্তর দিয়েছে হাসপাতালে আছি বাড়ি গিয়ে সব বলছি। রাত এগারোটা।নিলয়ের দেখা নেই।তিতাসা জোর করে বাবা,মাকে খাইয়ে দেয়।ড্রয়িং কাম ডাইনিংয়ের সোফায় বসে থাকতে থাকতে তিয়াসার চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে আসে।হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজে সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। উষ্কখুষ্ক চুল উদভ্রান্তের মত নিলয় ঘরে ঢোকে।ঘরে ঢুকেই সে সরাসরি উপরে উঠে গিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে ফ্রেস হয়ে টেবিলে খেতে বসে। তিয়াসা নিলয়ের খাবার সামনে গুছিয়ে দিয়ে নিজে একটা চেয়ার টেনে বসে। সেটা দেখতে পেয়ে নিলয় বলে,
--- তোমার বসে থাকার কোন দরকার নেই।আমি খেয়ে বাকি খাবার সব ফ্রিজে তুলে দেবো।
 ঠিক এই সময়ে নীলিমা খাবার টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে বলেন,
--- সেই সন্ধ্যায় বেড়িয়েছিস এত রাত করে ফিরলি মেয়েটা আমাদের খাইয়ে দিয়ে নিজে না খেয়ে তোর জন্য বসে আছে। তুই এসে খেতে বসে গেলি।একবারও জানতে চাইলি না সে খেয়েছে কিনা? উপরন্তু বলছিস তাকে চলে যেতে?
নিলয় অবাক হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- এত রাত পর্যন্ত না খেয়ে কেন বসে আছো? তুমি খাবে তোমার খিদেতে।ওসব দিন চলে গেছে যে স্বামীর জন্য না খেয়ে বসে থাকতে হবে।আমি এসব একদম পছন্দ করি না।নিজের খাবার নিয়ে খেতে বসো।
 কোন কথার উত্তর না দিয়ে তিয়াসা ঠাঁই বসে আছে দেখে নিলয় নিজেই একটা থালায় ভাত গুছিয়ে তার সামনে দেয়। এটা দেখতে পেয়ে নীলিমা সেখান থেকে দ্রুত চলে আসেন।এরপর নিলয় নিজেই তিয়াসার থালায় ডাল আর ভাজা তুলে দিয়ে বলে
-- অনেক রাত হল খেতে শুরু কর।
-- আমার যে তোমার কাছ থেকে অনেক কথা জানার আছে।
-- বলবো সব বলবো।একটু সময় দাও আমায়।তুমি মনেমনে যত খারাপ আমায় ভাবছো ঠিক ততটা খারাপ আমি নই। আমার জীবনের উপর থেকে একটা ঝড় বয়ে গেছে।সবকিছু তছনছ হয়ে আছে।নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে সময় দাও।আজ সারাটা সন্ধ্যা কেটেছে আমার হাসপাতালে।আমার পরিচিত একটি মেয়ে সুইসাইড অ্যাটেম করতে গিয়েছিল। তাকে নিয়েই সারাটাদিন ছুটোছুটি করেছি।না,না তুমি অন্য কিছু ভেবো না।ওকে আমি নিজের বোনের মত ভালোবাসি।
    তিয়াসা সে কথার কোন উত্তর দেয় না। ডাল দিয়ে ভাত মেখে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগে। দেখতে পেয়ে নিলয় বলে ওঠে,
--- থালায় ভাত নিয়ে শুধু নাড়িয়ে গেলেই পেট ভরবে না।আমি জানি তোমার মনে অনেক প্রশ্ন ভির করে আছে। বিয়েটা আমার ইচ্ছায় হয়নি অনুরোধে হয়েছে। হ্যাঁ বলতেই পারো কারো অনুরোধে তোমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আমি পারি না।অস্বীকার করছি না। দায়িত্ব যখন তোমার নিয়েছি তা পালনও করবো।শুধু একটু সময় চাইছি।
 কথা শেষ করে তিয়াসার থালায় ঝোল সহ একটা বড় মাছের টুকরো তুলে দেয় নিলয়। তিয়াসা নিলয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পরে।তার চোখের জল নিলয়ের চোখ এড়ায় না। কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করে নিজের খাবারের দিকে মন দেয়। ভাবতে থাকে সত্যিই তো তার জীবনের এই জটিলতার জন্য সে আর একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারে না। তবে যতদিন আদালতে কেস চলতে থাকবে সে কিছুতেই তিয়াসার সাথে স্বাভাবিক হতে পারবে না। কেসটা মিটে গেলেই সে সবকিছু জানিয়ে দেবে তিয়াসাকে। এই কেসের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত নিজের বাবা,মাকেও কিছু জানায়নি সে। তারা যখন বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছেন সে বারবার আপত্তি জানিয়েছিল।কিন্তু কিছুতেই কারণটা বলতে পারেনি। তাই তারাও তাদের ছেলের আপত্তিতে কান দেননি। 
  নিলয় খেয়ে উপরে উঠে যায়। তিয়াসা টেবিল মুছে,খাবার ফ্রিজে দিয়ে যখন উপরে নিজের ঘরে ঢোকে তখন দেখে খাটের উপর শুয়ে নিলয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ভালো করে গায়ে কম্বলটা দিয়ে ভাবতে থাকে গতকাল ফুলশয্যার খাটে না শুয়ে নিলয় সোফায় ঘুমিয়েছে। সে নিশ্চয়ই চায় না দু'জনে খাটে শুতে। তাই আস্তে করে নিলয়ের মাথার কাছ থেকে নিজের বালিশটা নিয়ে সোফায় শুয়ে পরে বাবার বিয়েতে দেওয়া ব্লাঙ্ককেটটা নিয়ে।কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম আসে না। আগামীকাল আবার দ্বীরাগমনে যাওয়ার কথা। নিলয়ের সাথে মনের মিল না হলেও এই একদিনেই সে বুঝে গেছে মানুষটা মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু কী যে মানুষটার সমস্যা সেটাই তো সে বলছে না। কাল যদি আবার ভোরে বেরিয়ে গিয়ে এত রাত করে ফেরে? তাহলে দ্বিরাগমনে তো যাওয়া হবে না।ওদিকে বাবা, মা,বোন বাজার রান্নাবান্না করে অপেক্ষা করতে থাকবেন। বাড়ির নানান কথা মনে পড়তে থাকে। নিজের জীবনে যা ঘটে গেছে সেটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। কিন্তু বাবাকে বোঝাতেই হবে পিয়াসাকে সাত তাড়না করে বিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।আগে ও হায়ার এডুকেশন নিয়ে একটা চাকরী পাক তারপর নাহয় বিয়ের কথা ভাবা যাবে। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে তিয়াসা ঘুমিয়ে পরে।
  এক ঘুমেই নিলয়ের ভোর হয়ে যায়।সে ঘুম থেকে জেগে দেখে তিয়াসা গুটিসুটি হয়ে সোফায় ঘুমিয়ে আছে। বড্ড মায়া হয় তার। মেয়েটার তো কোন দোষ নেই। কিন্তু সে যে কিছুতেই ওর কাছে ফ্রী হতে পারছে না। খামোখা একটা ঝামেলায় ফেঁসে গিয়ে নিজের জীবনের সুখশান্তি নষ্ট হয়ে গেলো। হঠাৎ নিলয়ের মনে পড়লো আজ আবার দ্বীরাগমনে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে।নিয়ম আর রিচুয়ালের চক্রবুহে আজ প্রায় সাতদিন ধরে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবুও বাবা,মায়ের মুখ চেয়ে সবই করে যেতে হচ্ছে। সে উঠে বাথরুমে ঢোকে।আর দরজা দেওয়ার শব্দে তিয়াসার ঘুম ভেংগে যায়। নিলয় বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে বিছানা,সোফা সুন্দরভাবে গুছিয়ে তিয়াসা জানলা দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। নিলয় যে বাথরুম থেকে ঘরে ঢুকেছে সে টের পায়নি। নিলয় ইচ্ছাকৃত ড্রেসিংটেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে একটু শব্দ করে। তিয়াসা ঘাড় ঘুরিয়ে নিলয়কে দেখে দ্রুত পায়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায়। পিছন থেকে নিলয় বলে ওঠে,
-- একটা কথা ছিলো ---

ক্রমশ --


 

বিধান (নূতন)

 অফিস থেকে বেরোতে নির্মলেন্দুবাবুর বেশ অনেকটাই আজ দেরি হয়ে যায়।অবশ্য শুধু তিনি একাই নন আজ বেশ কয়েকটি মিটিং থাকার ফলে তার সাথে আরো চার,পাঁচজন ছিলেন।কিন্তু কী আর করা যাবে কাজগুলো শেষ না করে তো আসা যায় না। অফিস থেকে বাড়ির রাস্তা গাড়িতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ তার নজরে পড়ে ফুটপাথে  একটা গাছের নীচে একজন শুয়ে আছেন আর তার পাশে বসে তারস্বরে একটি বাচ্চা কেঁদে চলেছে।গাড়ির আওয়াজে হয়ত সেই চিৎকার তার কানে আসতো না।কিন্তু ঠিক সেই জায়গাটাতেই তিনি ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে গেছিলেন। গাড়ির জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থেকে কী ভেবে তিনি গাড়িটা কিছুদূর এগিয়ে পার্ক করে বাচ্চাটার কাছে এগিয়ে যান।বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে মনেহল বছর চারেক বয়স হবে।বেশ কয়েকবার শুয়ে থাকা ভদ্রমহিলার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকেন।তারপর নাড়ি দেখে বুঝতে পারেন তিনি আর নেই। ওখানে দাঁড়িয়েই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে যোগাযোগ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সেখানে হাজির হয়ে যায়।বাচ্চা মেয়েটিকে কোলে তুলে গাড়িতে করে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।পুরো রাস্তাটাই সে কাঁদতে কাঁদতে আসে।
 দুই সন্তানের পিতা যখন ফুটপাথের একটি মেয়েকে কোলে নিয়ে নিজের বাড়িতে ঢোকেন তখন তার স্ত্রী সুস্মিতা বেশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।তিনি তার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
--- সব প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দেবো।কিন্তু তুমি আগে একটু গরম দুধ এনে বাচ্চাটিকে খাইয়ে দাও তো।সুস্মিতা কোন প্রশ্ন না করেই দুধ এনে স্বামীর কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিয়ে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে স্বামীর মুখ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনলেন এবং বললেন,
--- তাহলে এখন কী হবে?
--- কী আর হবে? দুটো ছেলে আছে আর একটা মেয়ে হল।
--- কিন্তু আইনী কাগজপত্র?
--- ভেবো না ওসব আমি সামলে নেবো।
 বাচ্চা মেয়েটিকে দেখলে কে বলবে যে তার জন্ম ফুটপাথে।যেমন স্বাস্থ্য ঠিক তেমন সুন্দর দেখতে। মাথা ভর্তি কোকড়ানো চুল।শুধু মলিন একটা জামা পরা।
চুকচুক করে এক নিমেষে সে গ্লাসের দুধটা শেষ করে সুস্মিতার কোলেই ঘুমে ঢলে পড়লো।সুস্মিতা হাত দিয়ে বাচ্চাটার মুখের উপর থেকে  চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললো,
--- ভগবান আছেন তাই তো আজ তোমাকে তিনি ওর কাছে নিয়ে গেছেন। কাল কিছু জামাকাপড় কিনে এনে তারপর অফিস যেও। আর যা যা করণীয় তাই কোরো ওকে আইনীভাবে আমাদের পেতে।
  সাত বছর ও দশ বছরের দুটি সন্তানের সাথে নির্মলেন্দুবাবু ও সুস্মিতার আদরের মেয়ে পরমাও বেশ আদরেই বড় হতে থাকে।মানুষ কথাই বলে, "জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো"- পরমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।বিধাতা তার ভাগ্যটাকে এভাবেই লিখেছিলেন।
    অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে পাড়াপ্রতিবেশীর কথার জ্বালে জড়াবেন না বলেই সেখানকার বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে অফিস যাতায়াতের সুবিধা হবে এই কথা বলে অন্যত্র ফ্ল্যাট কিনে চলে যান।তার ছেলে দুটিও পরমাকে নিজের বোন বলেই মেনে নিয়েছে।     নির্মলেন্দুবাবু আর সুস্মিতার ছেলেমেয়েগুলো আজ মানুষের মত মানুষ হয়েছে।বড় ছেলে প্রফেসর, ছোটটি ইঞ্জিনিয়ার আর পরমা বেশ নাম করা একজন ফ্যাশান ডিজাইনার।
 সময় এগিয়ে চলে চোখের পলকে। ছেলেদুটির বিয়ের পরেই সংসারে খুঁটিনাটি অশান্তি হতেই থাকে।কেউই আর বাবা,মায়ের কাছে দুদণ্ড বসে কথা বলার সময় পায় না। পরমা তার কাজের জন্য নানান সময়ে বাইরেই থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে এসেই সে মাকে বিশ্রাম দিতে কাজে লেগে পড়ে। রান্নারমাসীর রান্না করে রেখে যাওয়া খাবার গরম করে তাদের খেতে দেওয়া থেকে শুরু করে দু'জনের ওষুধটাও হাতে তুলে দেয়।এখন আর ছেলেরা কেউই কাছে থাকে না। নিত্য অশান্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে তারা এবাড়ি ছেড়ে তাদের বউ,বাচ্চা নিয়ে অন্যত্র থাকে। বুড়ো, বুড়ির এখন পরমাই ভরসা। অনেক চেষ্টা করেও মেয়েকে বিয়েতে রাজি করাতে পারেননি।তার এক কথা আমি চলে গেলে তোমাদের কে দেখবে? আর যখনই সে একথা বলে স্বামী,স্ত্রী বুকচেরা এক দীর্ঘনিশ্বাসের সাথে দু'জন দু'জনের মুখের দিকে তাকান। কিন্তু তবুও তারা একে ওকে বলতেই থাকেন পরমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতে।
 কিছুদিন ধরেই সুস্মিতার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পরমা তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটাছুটি করছে।নানান পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা গেলো কিডনী দু'টোই খারাপ হয়ে গেছে। ছেলেদের খবর দেওয়া হল। তারা এসে কিছু জ্ঞান দিয়ে চলে গেলো। কিন্ডনী ট্রান্সপ্লান্ট এর জন্য নানান জায়গায় চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু হাতে সময় খুব কম। প্রচুর টাকার বিনিময়েও কোন লোক পাওয়া যাচ্ছে না।পরমা আর কোন উপায় না দেখে তার মাকে বাঁচাতে নিজেই কিডনী দেবে ঠিক করে।বাবা,মাকে না জানিয়ে তার পরীক্ষানিরীক্ষা চলতে থাকে।আশ্চর্যের বিষয় সমস্ত পরীক্ষায় পরমা উৎরে যায়।সব কাজ সেরে যখন সে বাবাকে এসে বললো তখন বাবা বেঁকে বসলেন।তিনি কিছুতেই রাজি নন।পরমা অনেক চেষ্টা করলো বাবাকে বোঝাতে শেষে না পেরে বলে উঠলো,
--- তোমরা আমার জন্য যা করেছো তার ঋণ পুরো জীবন দিয়ে দিলেও শোধ হবে না --
 নির্মলেন্দুবাবু কেঁপে উঠলেন। পরমা কী সব জেনে গেলো?
-- কী বলছিস তুই? আমি বুঝতে পারছি না --
-- বাবা,আমি সব জানি।
--- কী জানিস আর কী করেই বা জানলি? আমরা তো তোকে কিছু কখনো বলিনি। আর তখন তো তুই খুব ছোট ছিলি। তোর মনে থাকার কথাও নয়। তুই আমাকে বল কে তোকে বলেছে এসব কথা।
--- দেখো বাবা, আমাকে মানুষ করেছো বলেই নয়।তুমি আমাকে জন্ম দিলেও আজ মায়ের এই অসুস্থতায় আমি এই সিদ্ধান্তই নিতাম।
-- সেসব পড়ে হবে।তুই আমাকে আগে বল একথা তোকে কে বলেছে?
--- আমাকে কেউ বলেনি বাবা।যেদিন বড়দা ঝামেলা করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো সেদিন তার ঘরে খুব চিৎকার করে করে বৌদিকে বলছিলো," রাস্তায় পড়ে থাকা এক ভিখারীর মেয়ের জন্য দরদ উথলে পড়ছে। যেদিন বাড়িঘর সব লিখিয়ে নিয়ে বাবা,মাকে রাস্তায় বসিয়ে দেবে সেদিন এই ছেলের দরজাতেই আসতে হবে।"
 নির্মলেন্দুবাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। পরমা বাবার কাছে এগিয়ে তার হাতদু'টি ধরে বললো,
--- বিশ্বাস করো বাবা এরজন্য আমার একটুও কষ্ট নেই।বরং সেদিনের পর থেকে তোমাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা,ভালোবাসা দুইই বেড়ে গেছে।
 নির্মলেন্দুবাবু তার আদরের কন্যার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন আর চোখ থেকে তার জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
                    শেষ
 
 
 

Saturday, December 17, 2022

সময়ই উত্তর দেয় (অর্বাচীন ওয়েব ম্যাগাজিন)

সময়ই উত্তর দেয়

    আমি তখন স্কুলের গণ্ডি পেরোইনি। মাধ্যমিক দেবো সে বছর। দ্বাদশ শ্রেণীর দেবমাল্য আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের হাত দিয়ে একটি চিঠি পাঠালো আমায়।চিঠি পড়ে আমি তো থ! সে আমাকে প্রেম নিবেদন করেছে।জয়িতার মাধ্যমেই জানিয়ে দিলাম প্রেম এভাবে হয় না।ভালোবাসা হল দু'টি হৃদয়ের মিলন।তার আমাকে ভালো লাগলে আমার তাকে যে ভালোবাসতে হবে এমন কোন কথা তো নেই। আর এভাবে ভালোবাসা হয় না।তাছাড়া পড়াশুনা শেষ করার আগে এসব নিয়ে ভাবতে গেলে জীবনে পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করতে পারবো না। আমি এসব নিয়ে এখন চিন্তা করতেই চাই না।
 এরপর যতদিন দেবমাল্য স্কুলে ছিল বলতে গেলে আমার সামনে আর কোনদিন আসেনি।আমিও তাকে দেখতে পাইনি।
 আমি যখন উচ্চমাধ্যমিক দেবো তখন হঠাৎ একদিন আবার তার সাথে আমার রাস্তায় দেখা।আমি কোচিং থেকে আসছিলাম।সেদিন রাস্তায় আলো ছিলো না। লোকজনও খুব একটা রাস্তায় ছিল না।তার সেই একই প্রস্তাব।তাকে সরাসরিই বললাম,"প্রেম এভাবে হয় না"
আমার কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দেবমাল্য আমায় ওর বুকের সাথে চেপে ধরে জোর করে ওর মুখটা এগিয়ে এনে আমার ঠোঁটে আলতো এক কামড় দিয়ে বললো,"তাহলে কী প্রেম এভাবে হয়!" জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওর মুখে জোরে একটা থাপ্পড় মেরে বলি,"তোমার মত ছেলের এটাই প্রাপ্তি"।মুহূর্তে ও আমার গায়ের থেকে ওড়নাটা ছিনিয়ে নিয়ে কাছে আরো কাছে এগিয়ে আসতে গেলে আমি বলি,
"আমার দিকে আর এক পা এগোলে আমি কিন্তু চিৎকার করে লোক ডাকবো। তোমার কলেজকে সব জানিয়ে দেবো।" আমার কথা শুনে দেবমাল্য কিছুটা থমকে যায়।আমিও আর সেখানে এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে জোর পায়ে সেখান থেকে চলে আসি।মুখে তাকে যাই বলি না কেন কয়েকদিন বেশ ভয়ে ভয়েই কেটেছে আমার। বাড়িতে ইচ্ছা করেই কিছু বললাম না তাদের টেনশন আমায় নিয়ে বেড়ে যাবে মনে করে।
  অনেক বছর কেটে গেছে এরপর।দেবমাল্যর সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয়নি।বাড়ির প্রচণ্ড চাপ স্বর্তেও বিয়ের পিঁড়িতে বসিনি। কারণ আমি যে প্রফেশনে আছি তার ডিউটির কোন ঠিক ঠিকানা নেই।রাত-বিরেতে যখন তখন ছুটতে হয়। প্রাণহানিরও ভয় রয়েছে। পরের বাড়িতে কিছুতেই এসব মেনে নেবে না।
   থানায় বসে কাগজপত্র দেখছিলাম।হঠাৎ একটি কাগজে চোখ আটকে গেলো। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে।মেয়েটির বাড়ির লোক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া দুটি ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।ফিরে গেলাম কয়েক যুগ আগে।মাথাটা এক নিমেষে গরম হয়ে গেলো। ইনভেস্টিগেশন শুরু হলেও ঢিমেতালে কেসটা এগোচ্ছে। যে ইন্সপেক্টর কেসটা দেখছেন তাকে ডেকে কতদূর কেসটা এগিয়েছে জানতে চাওয়ায় তিনি আমতা আমতা করে উত্তর দিলেন। নিজেই কেসটার দায়িত্ব নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম। প্রমাণ যা কিছু পেলাম ছেলেদু'টিকে  অ্যারেস্ট করে আগে থানায় এনে তুললাম। রাতেই হুমকি দিয়ে এক ফোন। প্রথমে টাকার লোভ পড়ে রীতিমত হুমকি গলাটা খুব চেনা চেনা মনেহল।
 পরদিন আই পি এস অফিসার নন্দিতা রায় চৌধুরীর সাথে ধর্ষক পুত্রের পিতা কোর্ট খোলার আগেই দেখা করতে এলেন। এসেই তিনি টেবিলের উপর একটি ব্যাগ রাখলেন।তাকে দেখে চমকে উঠলাম।সে অবশ্য আমাকে প্রথম অবস্থায় চিনতেই পারেনি। জীবনে প্রতিটা ঘটনার পিছনে সুফল এবং কুফল দু'টোই থাকে। দেবমাল্যর ওই অপমানের জবাব শুধু থাপ্পড়ে দিয়ে আমার পোশায়নি সেদিন। তখনই ভেবে নিয়েছিলাম জীবনে যত প্রতিকূল পরিস্থিতিই আসুক না কেন আমি যেভাবেই হোক প্রশাসন বিভাগে চাকরি করবো। তার ফল হাতে হাতে পেয়েছি।প্রথমেই ধর্ষক পুত্রের পিতার কাছে জানতে চাইলাম ,
--- দেবমাল্য মজুমদার, আপনি কি আমায় চিনতে পারছেন?
লক্ষ্য করলাম যে তেজ নিয়ে তিনি আই পি এস অফিসারের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তা এক নিমেষে উধাও! তাকে একথাও বললাম সেদিন তার ওই অপমান আজ আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। 
 দেবমাল্য হাত জোড় করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে টেবিলের উপর রাখা হয়ত টাকা ভর্তি ব্যাগটি নিয়ে সেই মুহূর্তে তাকে বেরিয়ে যেতে বললাম। দেবমাল্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার পায়ে হাত দিতে গেলো।আমি হেসে পড়ে রুম ত্যাগ করলাম।
 ছেলে দু'টির যাবতজীবন জেল হল।এতদিন পর মনেহল আমি আমার অপমানের জবাব দিতে পারলাম।

                শেষ
 
 

Friday, December 16, 2022

একদিন ভালোবাসবে (দ্বিতীয় পর্ব)


একদিন ভালোবাসবে (দ্বিতীয় পর্ব)
  
     
- আমার একটা কথা আছে তোর সাথে --- তুই বাসের ভিতর আমার পাশে বসিস তখন বলবো --
 নিলয়ের বুকের ভিতর তখন কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে -- কী বলতে চাইছে শ্রাবণী তাকে। এতক্ষণ শ্রাবনীকে মন খারাপ করতে সে নিষেধ করেছে আর এখন সে নিজেই উদাস হয়ে যাচ্ছে।তাহলে কী শ্রাবণী তার মনের কথা টের পেয়েছে? কিন্তু সেতো কোন কথা তাকে কখনোই বলেনি। নাকি শ্রাবণীর তার প্রতি কোন দুর্বলতা গ্রো করেছে? কি বলতে চায় সে নিলয়কে?

     তিয়াসা তার শ্বশুরের জন্য বেশ গামাখা মাংসের মত করে বোয়াল মাছ রান্না করে দুপুরে বাটিতে করে এনে সামনে রাখলো।সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাটিটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে ঘ্রাণ শুকে বললেন,
--- গিন্নি, মায়ের আমার রান্নার হাতটি বেশ চমৎকার মনেহচ্ছে।বেশ সুন্দর একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। তা তোমরাও বসে পরো একসাথেই চারজনে খেয়ে নিই।ক'দিন যা ধকল গেলো সকলের উপর থেকে আজ আত্মীয়রা সবাই চলেই যখন গেলেন সবাই দুপুরে একটু বিশ্রাম নিই।
 নিলয়ের দিকে মুখ করে বললেন,
--- কী রে নীলু? তুই তো খেয়েই চলেছিস গবগব করে। রান্নাটা কেমন হয়েছে বল?
নিলয় সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো
--- ভালো।
--- রান্নার প্রশংসা করতে শেখ বাবা। মেয়েরা অনেক কষ্ট করে যত্ন নিয়ে রান্না করে। প্রশংসা করলে কষ্টটা তাদের কাছে আর কষ্ট থাকে না।
--- তুমি তো প্রশংসা করছো আবার আমি কেন?
 তিয়াসা খেতে খেতে বারবার নিলয়কে লক্ষ্য করে। কিন্তু নিলয় নিজের মনে খেয়ে চলেছে। কারও আলোচনায় সে কোনোই উত্তর করে না।
  এইভাবেই সকলের আগে খাওয়া শেষ করে ড্রয়িংয়ে টিভি চালিয়ে সোফায় বসে দেখতে দেখতে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।নিলয়ের এই সোফায় ঘুমিয়ে পড়া দেখে শ্বাশুড়ী বকবক করতে থাকেন। তিয়াসাকে বলেন,
-- যা মা তুই তোর ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে।
 তিয়াসা বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।দুপুরে ঘুমানো তার কোন কালেই অভ্যাস নেই। কাল সারাটা রাত জেগে।তারউপর ফুলশয্যার রাতে স্বামীর ব্যবহারে সে সত্যিই অবাক! তারমানে এ বিয়েতে নিলয়ের মত ছিল না। যদি তাইই হয় সে কেন বিয়েটা করলো? তাহলে কী নিলয় অন্য কাউকে ভালোবাসে? মনেমনে ভাবে 'আমি তো মানুষটাকে চিনতামই না, আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করলো কেন?আমার তো কোন অপরাধ ছিল না --।'
 দুই বোনের মধ্যে তিয়াসাই বড়।ইংলিশে অনার্স করা তিয়াসা চেয়েছিল শিক্ষকতা করবে। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবা বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। তিয়াসার সহপাঠী সৌম্য যে তাকে পছন্দ করতো তিয়াসা তা ভালোভাবেই জানতো।কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কোনদিন কাউকে মনের কথা বলেনি। অত বড়লোকের সুদর্শন ছেলে তিয়াসার সাহসে কুলিয়ে ওঠেনি তাকে মনের কথাটা খুলে বলার।সৌম্য ছিল ধীর,শান্ত স্বভাবের ছেলে। সকলের সাথেই কথা বলতো, মিশতো কিন্তু চুপচাপ হয়েই থাকতো। সব সময়ই সে শুনতো বেশি কিন্তু বলতো কম।
  রেজাল্ট বেরোনোর সাথে সাথেই বাবার সিদ্ধান্ত মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। মা তন্দ্রার অবশ্য মত ছিল না এখনই বিয়ে দেওয়ার।কিন্তু বাবা অনিল দাস অনেক আগে থাকতেই ছেলে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিলেন। বাবা জানিয়েছিলেন,
-- চাকরি যদি করতেই হয় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কোরো আমি যে বাড়িতে তোমার বিয়ে দেবো সেখানে কথা বলেই নেবো।তারা রাজি হলেই আমি সেখানে বিয়ের ব্যবস্থা করবো। কিন্তু একটা কথা বোঝো আমার বয়স হয়েছে ,তোমার ছোটবোন পিয়াসার পড়াশুনা এখনো শেষ হয়নি। হঠাৎ করে আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তোমার মা পড়বেন অথৈ সমুদ্রে।আর পুরো সংসারের জোয়াল এসে পড়বে তোমার ঘাড়ে। তোমার জীবনটা তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।এই সংসারের দায়িত্ব আমার। আমার অবর্তমানে এই সংসারের জন্য তোমার জীবনটা শেষ হয়ে যাক এটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না। চাকরির চেষ্টা তুমি করে যাও যদি বিয়ের আগে তুমি চাকরি পেয়ে যাও তো ভালোই আর বিয়ে দেবো বললেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না।তার জন্যও তো সময় লাগবে।
 বাবার এই কথার পরে তিয়াসা কিংবা তার মা কোন কথাই আর বলতে পারেননি। বিয়ে হয়ে যায় তিয়াসার। বিয়ের আগে সে নিলয়কে দেখেনি। বাবার পছন্দ করা ছেলেকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিয়েছে।কিন্তু তিয়াসা স্বপ্নেও ভাবেনি ফুলশয্য্যার রাতে তার স্বামীর কাছ থেকে সে এরূপ ব্যবহার পাবে।এসব কথা ভাবতে ভাবতে সারারাতের না ঘুমানোর ফলে তিয়াসা একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎ ঘরের লাইট জ্বলে উঠায় তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পাঁচটা বেজে গেছে।শীতের দিনে বিকেল পাঁচটা মানেই চারিদিকে অন্ধকার হয়ে যাওয়া।তাড়াতাড়ি উঠে পরে দেখে নিলয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে।চুপচাপ উঠে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন নিলয় তাকে বলে,
-- আমি একটু বেরোচ্ছি।
 তিয়াসা অবাক হয়।যে মানুষটা তাকে স্ত্রীর মর্যাদায় দিলো না সে আবার বেরোনোর সময় বলে বেরোচ্ছে।নিলয় হয়ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যপারটা বুঝতে পেরেছে তাই আবারও বললো,
--- আসলে মা এখন ঠাকুরঘরে।এই সময় সেখানে ঢোকা নিষেধ কারো।বাবা ঘুমাচ্ছেন। মা তো তোমার কাছেই জানতে চাইবেন তাই আর কি!
তিয়াসা সে কথারও কোন উত্তর দেয় না।সে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচুতে নেমে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে। নিলয় বেরিয়ে যায়।
 নীলিমা তার পুজো সেরে এসে রান্নাঘরে ঢুকে দেখে তিয়াসা কাজের মহিলার সাথে গল্প করছে। তিনি ঢোকার সাথে সাথেই তিয়াসা বলে,
--- মা চা করি?
--- হ্যাঁ চা তো খাবো।কিন্তু তুই বোস আমি করছি।
--- তুমি বরং বসো।আমি করছি।এগুলো এখন আমার দায়িত্ব।
 নীলিমা ভীষণ খুশি হলেন তিয়াসার কথা শুনে।তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
--- তুই তো দেখছি আমাকে একেবারে কুড়ে বানিয়ে দিবি।
--- নীলু কি ঘরে আছে নাকি ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে গেছে?
--- বেড়িয়েছেন
--- ছেলেটা আমার এমনিতে খুবই ভালো রে কিন্তু কী জানিস অল্প বয়সে মানুষের অনেক ভুলভ্রান্তি থাকে। সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে ----
 কথাটা নীলিমা শেষ করার আগেই বসবার ঘর থেকে অজয়ের গলা শোনা গেলো 
--- কই গো তোমরা চা টা নিয়ে এখানে আসো গল্প করতে করতে সবাই মিলে চা খাই।
--- ওই এলেন উনি।তুই এক কাজ কর মা সকলের চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আয়।
নীলিমা সেই প্রসঙ্গে আর গেলেন না দেখে তিয়াসা তাকে মনে করিয়ে দিলো
--- কী যেন বলছিলেন মা?
--- হ্যাঁ তোর বাবা এসব জানেন না। পরে একসময় তোকে সব বলবো।তোকে তো সব জানতেই হবে রে -- কাল নীলু তোকে কিছু বলেনি?
বুকের ভিতরের কষ্টটাকে চেপে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিয়াসা কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলে,
--- মা, চা হয়ে গেছে তুমি যাও ওঘরে আমি চা নিয়ে আসছি।
নীলিমা আর কিছু না বলে উঠে এলেন আর তিয়াসা চা নিয়ে বসবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে বেশ হন্তদন্ত হয়ে নিলয় ঘরে ঢুকেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।অজয় দেখতে পেয়েই চিৎকার করে বললেন,
--- কী হয়েছে নীলু এভাবে ছুটছিস কেন? আয় একসাথে বসে চা খাই।
 কথাটা যার উদ্দেশ্যে বলা তার কানে গেলো কিনা কেউই বুঝতে পারলো না কিন্তু সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নেমে এসে বললো,
--- মা আমি একটা বিশেষ কাজে বেরোচ্ছি কখন ফিরবো বলতে পারছি না।
--- কী হয়েছে টা কী সেটা তো বলবি?
 নীলিমা ছেলের উদ্দেশ্যে কথাটা বললেন।নিলয় দ্রুত বেরোতে বেরোতেই বললো,
--- কী হয়েছে আগে নিজে সব ভালোভাবে জানি তারপর নাহয় তোমাদের এসে সব বলবো।

ক্রমশ 




    

Wednesday, November 30, 2022

একদিন ভালোবাসবে (প্রথম পর্ব)

একদিন ভালোবাসবে (প্রথম পর্ব)       

  আজ তিয়াসা আর নিলয়ের ফুল শয্যা। সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে তিয়াসাকে নিয়ে বাড়ির বউ, মেয়েরা ইয়ার্কি ঠাট্টায় মেতেছে।হঠাৎ একজনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো,
-- এই রে দুটো বাজে,সবাই চল।নিলয়টা এই হিমের মধ্যে সেই থেকে বাইরে অপেক্ষা করছে।
 সকলে যে যার মত হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো। তিতাসা আপাদমস্তক ফুল এবং সোনার গয়নায় সজ্জিত হয়ে গুটিসুটি মেরে খাটের মাঝখানে বসে তার জীবনের বহু আকাঙ্খিত রাতটির জন্য। কিন্তু সময় তো বয়েই চলেছে নিলয়ের কোন পাত্তা নেই।এক সময় তিয়াসার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে।তার বারবার হাই উঠতে থাকে। সে একটা বালিশে মাথা দিয়ে সবে শুয়েছে এরমধ্যে দরজা দেওয়ার শব্দে পুনরায় উঠে বসতে গেলে নিলয় তাকে বলে,
--- উঠতে হবে না। তোমার ঘুম পেয়েছে বুঝতে পারছি।ঘুমিয়ে পরো। আজ আর কোন কথা নয়। কাল সব কথা হবে।
 তিয়াসা উঠে বসেছিল।নিলয় কথা শেষ করে বিছানার থেকে মাথার বালিশটা নিয়ে সোফার দিকে এগোতে লাগলে তিতাসা প্রচণ্ড অবাক হয়ে তাকে বলে,
--- তুমি খাটে শোবে না?
নিলয় কিছুটা থমকে যায়। পিছন ফিরেই উত্তর দেয়
--- কিছু কথা আমার বলার আছে । আজ খুব টায়ার্ড আছি। কিন্তু কথাগুলো তোমাকে বলার খুব দরকার। আজ রাতটা যাক কাল সব বলবো। তুমি খাটে শুয়ে পরো আমি সোফায় শুচ্ছি।
 বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিনা বাক্যব্যায়ে মেনে নিয়ে মনের মধ্যে সুখের সংসারের স্বপ্নকে লালিত করে বিয়ের পিঁড়িতে বসা তিয়াসা নতুন জীবনের শুরুতেই এ ধাক্কাটা খেয়ে কী বলবে কিংবা কী করবে বুঝতে না পেরে একটা আহত পাখির মত নাইট ল্যাম্পের আলোয় কিছুক্ষণ- শুয়ে থাকা নিলয়ের দিকে তাকিয়ে একবুক কষ্ট নিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে।বুক চিরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে।বুঝতে পারে তার জীবনটা শুরু হতে চলেছে ফুলশয্যায় নয় কাঁটা মোড়া শয্যায়!কিন্তু একটু আগে যে রাজ্যের ঘুম তার দু'চোখ জুড়ে ছিল সেই ঘুম যেন এক অদৃশ্য মায়াবলে কোথায় উধাও হয়ে গেছে। সারাটা রাত আর তার ঘুম আসেনি।
  পরদিন সকালবেলা সবই স্বাভাবিক। তিয়াসা ঘুম থেকে উঠে দেখে নিলয় তখনো সোফায় শুয়ে। সে স্নান সেরে ঘরে ঢুকে দেখে নিলয় তার মাথার বালিশ আর গায়ের চাদরটা ভাঁজ করে খাটের উপর রেখে গেছে। কাল রাতের টাটকা ফুলগুলো আজ শুকিয়ে সব নেতিয়ে পড়েছে। ঠিক তার জীবনের স্বপ্ন দেখা রাতটির মত।একটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ এনে তিয়াসা সমস্ত ফুলগুলো ব্যাগের ভিতর পুরে খাটটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে নিচুতে নামে। নিলয় আর তার বাবা ডাইনিংয়ে বসে চা খাচ্ছিলেন। তিয়াসাকে দেখতে পেয়ে তিনি বলে উঠলেন,
-- আয় মা এখানে এসে বোস। জানিস তো মা আমার একটা মেয়ের খুব শখ ছিল। আজ সে অভাবটা আমার পূরণ হয়েছে তুই এ বাড়িতে বউ নয় মেয়েই হয়ে থাকবি। আমার আর তোর মায়ের কাছে আবদার করবি। এই যে নীলুকে দেখছিস একে কিচ্ছু তোর বলতে হবে না। আমি তো বাড়িতে বউ আনিনি একটা মেয়ে এনেছি। মেয়ে মানেই ঘরের লক্ষী। তুই এ বাড়ির লক্ষী।
  তিয়াসা চুপ করে তার শ্বশুরের কথাগুলো শুনে যাচ্ছে।তিনি অনর্গল কথা বলেই চলেছেন এরই মাঝে শ্বাশুড়ী নীলিমা নিজের ও তার পুত্রবধূটির জন্য চা নিয়ে এসে বসলেন একটা চেয়ার টেনে।স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
--- ওরে তুমি এবার একটু থামো। সেই থেকে কথা বলেই চলেছ। হ্যাঁরে মা তুই বোয়াল মাছ খাস তো? 
 তিয়াসা মাথা নেড়ে "না" বলতেই নীলিমা স্বামীর দিকে মুখ করে বলে উঠলেন,
--- নিজে যা যা ভালো খায় আজ তাই বাজার করে নিয়ে এসেছে। আমি বলেছিলাম বোয়াল মাছ সকলে পছন্দ করে না।ছেলেকে বললেন,
--- এই নীলু তুই একবার বাজার যা তো।অন্য কোন মাছ নিয়ে আয়।
 নিলয় চা খাওয়া শেষ করে পেপার নিয়ে পড়ছিল। মায়ের কথা শুনে একটু বিরক্তির সুরে বলে উঠলো,
--- কেন তোমার ফ্রিজে আর কোন মাছ নেই।আজকের দিনটা চালিয়ে দাও না - কাল ---
 কথা শেষ হওয়ার আগেই তিয়াসা খুব আস্তে বলল,
--- মা, যা আছে আজ তাই দিয়েই খাবো।নতুন করে আবার বাজারে যাওয়ার দরকার নেই।
 নীলিমার হঠাৎ মনে পড়ল ফ্রিজে তো গলদা চিংড়ি রয়েছে।তিনি বললেন,
--- ও হরি! আমি তো ভুলেই গেছিলাম ফ্রিজে তো গলদা চিংড়ি রয়েছে।নিলয়ের আইবুড়ো ভাত দিতে আনা হয়েছিল।কিছু রান্না হয়েছিল আর কিছু ফ্রীজে রেখেছিলাম।আজ তাহলে চিংড়ির মালাইকারি করি।বোয়াল কাল করবো।
--- তুমি চিংড়ির মালাইকারি করো আর আমি বাবার জন্য বোয়ালটা রান্না করি।
 তিয়াসার কথা শুনে শ্বশুর অজয় হাসতে হাসতে বলে উঠলেন,
--- দেখো গিন্নি দেখো কেমন মেয়ে পছন্দ করেছি।
 নিলয় তখন আড়চোখে তিয়াসাকে দেখে আবার পেপার পড়ায় মন দেয়। কিন্তু নিলয়ের এই আড়চোখে তাকানো তিয়াসার নজর এড়ায় না। কাল রাতের কথাগুলো তিয়াসার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সেই থেকে। কালকে নিলয়ের বলা কথাগুলো এটাই প্রমাণ করে তারমানে এ বিয়েতে নিলয়ের কোন মত ছিলো না। সে হয়ত অন্য কাউকে ভালোবাসে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার শ্বশুর,শ্বাশুড়ির ব্যবহারে নিলয়ের কালকের বলা কথাগুলো একটু সময়ের জন্য হলেও ভুলে ছিল। কিন্তু নিলয়ের এই তাকানোতে আবার তারমধ্যে কিছুটা উদাস ভাব চলে আসে।নীলিমার কথায় তার সম্বিত ফেরে।
--- চল মা আমরা দু'জনে গিয়ে টিফিনটা করে ফেলি।

২. 
 কলেজ ফেস্টে গান শুনে নিলয়ের মত অনেক ছেলের বুকেই একটা সুর ধরিয়ে দিয়েছিল শ্রাবণী দত্ত।সুন্দরী শ্রাবণী অবশ্য কাউকেই পাত্তা দিত না। অনেক ছেলেই কারণে,অকারণে তার সাথে কথা বলতে এসেছে।ভদ্রতার খাতিরে তাদের সেসব কথার জবাব দিলেও কাউকেই সেভাবে কোনদিন অন্য কোন কথা বলার সুযোগ দেয়নি। নিজের ভিতর সব সময় একটা গাম্ভীর্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে। কারণ সে জানতো তার রক্ষণশীল পরিবারের পিতামাতা কোনদিনও তার পছন্দ করা ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন না। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে যখন সে কলেজে ভর্তি হয় তখনই তার বাবা তাকে ডেকে স্মরণ করিয়ে দেন,
-- ছেলেদের সাথে একসাথে পড়তে যাচ্ছ খুব ভালো কথা। সবাই সেখানে ক্লাসমেট এবং সেই নজরেই তাদের দেখো। কোন ছেলের সাথে বেশি মেলামেশা করতে যেও না। পড়াশুনা শেষ করো ওসব নিয়ে আমরা ভাববো পরে।
  বাবার জীদ, বাবার রাগ সম্পর্কে ছোট থেকেই শ্রাবণী ওয়াকিবহাল। মা আজও বাবাকে জমের মত ভয় পান পান থেকে চুন খসলেই তিনি বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে তোলেন। বাড়িতে মাত্র তিনটে প্রাণী। মা,মেয়ে কেউই প্রয়োজন না হলে জেদী, রাগী,একগুঁয়ে মানুষটার সাথে কথা বলেন না।আর তিনিও নিজের মনেই থাকেন।
  শ্রাবণীর বাবা সাত্যকী দত্ত বেসরকারি একটি কোম্পানির ম্যানেজার হিসাবে সৎ পথে চাকরি করার পর আজ বছর খানেক হল তিনি রিটায়ার করেছেন। অফিসে তিনি নরম স্বভাবের মানুষ হলেও বাড়িতে তার কথার উপর কেউ কথা বলতে পারে না।মা,মেয়ে সর্বদাই তার ভয়ে যুজুবুরি হয়ে থাকে।
 কলেজ পিকনিকে সকলে যাচ্ছে। শ্রাবণীরও ইচ্ছা সে যাবে। কিন্তু বাবার ভয়ে সে কথাটা তাকে বলতেই পারছে না।মাকে গিয়ে বলায় তার মা ভয়ে ভয়ে স্বামীকে কথাটা জানান কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান।কিন্তু সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরতে হবে সে কথা জানিয়ে দেন।
   ঠাকুরপুকুর কলেজের সামনের থেকেই বাস ছাড়ে। সকলে সময় মত সেখানে উপস্থিত হয়ে যায়।নির্দিষ্ট সময়ে বাস ডায়মন্ড হারবার গঙ্গার কাছে পিকনিক স্পটে চলে আসে। শ্রাবণী তার এক বন্ধুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে পিকনিক স্পট থেকে অনেকটা দুর চলে আসে। দুপুরে খাওয়ার সময় তাদের দেখতে না পেয়ে নিলয় ও তার এক বন্ধু তাদের খুঁজতে যায়। হঠাৎ তারা লক্ষ্য করে কিছুটা দূরে আর একটি পিকনিক দলের বেশ কয়েকটি ছেলে শ্রাবণী এবং তার বন্ধুকে মধ্যপ অবস্থায় ঘিরে ধরে উত্যক্ত করে চলেছে। কিছুতেই ওরা দু'জনে ওদের কাছ থেকে সরে আসতে পারছে না। নিলয় ও তার বন্ধু দৌড়ে গিয়ে তাদের রক্ষা করে।কিন্তু শ্রাবণীর ওড়নাটি তাদের দখলেই চলে যায়। কাঁধের কাছে জামার কিছুটা অংশও ছেড়া দেখতে পেয়ে নিলয় তার গায়ের জ্যাকেটটা খুলে তার দিকে এগিয়ে দেয়।
  বিনা বাক্যব্যয়ে শ্রাবণী জ্যাকেটটা নিয়ে গায়ে পরে নেয়। সেই থেকেই শ্রাবণী একটু উদাস হয়ে যায় যা নিলয়ের চোখ এড়ায় না। নিলয় সুযোগ বুঝে শ্রাবনীকে বলে,
--- এতটা ভাবার কী আছে? যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে লাভ কী? এনজয় কর।
--- আমার একটা কথা আছে তোর সাথে --- তুই বাসের ভিতর আমার পাশে বসিস তখন বলবো --
 নিলয়ের বুকের ভিতর তখন কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে --

ক্রমশ 



  
    

Monday, November 28, 2022

মাথা তুলে বাঁচো

মাথা তুলে বাঁচো 
  দেবেশের মৃত্যুর পর ছোট ছোট দু'টি ছেলেমেয়ে নিয়ে রেখা খুবই অসহায় হয়ে পড়ে।একটা সাধারণ প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করা দেবেশ সঞ্চয় বলতে কিছুই রেখে যেতে পারেনি।কাজের দিনে এসে অফিসের কিছু লোক কয়েক হাজার টাকা দিয়ে গেলো।কাজটাই শুধু হল।কারণ তাদের অবস্থার কথা যেহেতু সকলেই জানত তাই ওইদিন আসার কথা বললে অধিকাংশ পরিবারই জানিয়েছে তারা শ্রাদ্ধ বাড়ি খায় না। এসেছেন তারা সকলেই কাগজের ছোট প্যাকেট মুড়ে যার যেমন ক্ষমতা সেইরূপ টাকা নিয়ে।একটা মিষ্টি আর একগ্লাস জল ছাড়া তারা কিছুই মুখে দেননি।
 দিশেহারা রেখা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না কী করে ছেলেমেয়ে দু'টিকে মানুষ করবে। শেষে ঠিক করলো যদি দু'একটা বাড়িতে সে রান্নার কাজ নেয় তাহলে মাস গেলে অন্তত কিছু টাকা তো আসবে। মাধ্যমিক পাশ করা বিদ্যেই এর চেয়ে বেশি আর কিইবা সে করতে পারে। মাথা গোঁজার মত একটু নিজস্ব ঠাঁই ছিল তাই বাঁচোয়া। তানাহলে তো বাচ্চা দুটোকে নিয়ে মাথার উপর ছাদ হারা হতে হত।
  একজন ক্লাস ফোর আর একজন ক্লাস সেভেন। কোন রকমে দিন চলে যেতে থাকে। সকাল সন্ধ্যা দুটি বাড়িতে রান্না করে যে টাকা আসে তাতে ডালভাত দু'বেলা জুঠে যায় তিনজনে। তাছাড়া বোসগিন্নি বেশ ভালো মানুষ।সময়ে অসময়ে কিছু খাবার আবার অনেক সময় কাচা শাকসবজি,মাছও দিয়ে দেন বাচ্চা দু'টির জন্য। আস্তে আস্তে ওরা বড় হতে থাকে আর ওদের পড়ার খরচ বাড়তে থাকে। গয়না দু'একটি যা ছিল সেগুলো একটু একটু করে বিক্রি করতে থাকে।কিন্তু সে টাকায় ক'দিন?
আস্তে আস্তে আরো দুটি বাড়ি রান্নার জন্য ধরে নেয়। ভোর পাঁচটা থেকে তার ছোটা শুরু হয়। একফাঁকে বাড়িতে এসে ঝটপট বাচ্চাদের স্কুলে বেরোনোর আগে কিছু রান্না করে রেখে যায়।সে কোনদিন ডালভাত কিংবা আলু সেদ্ধ ভাত। ছেলেমেয়ে দুটিই মায়ের এই পরিশ্রম দেখে যা মা জোগাড় করতে পারে তাই দিয়েই খেয়ে নেয়। কখনোই কোন অভিযোগ কোনদিন করেনি।ছেলেটি ছোট আর মেয়ে বড়।দেখতে দেখতে সময় চলে যায়।সামনেই মেয়ে মাধ্যমিক দেবে। রান্নাতেও মায়ের মত পটু। এখন সকালে রেখা বেরিয়ে একবারে সব বাড়ি কাজ সেরে তবে ঘরে ঢোকে।মেয়েই ভায়ের স্কুলের খাবার নিজেদের দুপুরের খাবার করে নেয়।
 মায়ের এই পরিশ্রম তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে বলেই তারা দিনরাত চেষ্টা করে পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। আস্তে আস্তে তারা ক্লাসে ভালো ফল করতেও শুরু করে।বড় মেয়ে রুমনা মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে পাশ করে। যে সব বিষয় রুমনা বুঝতে পারতো না স্কুল শিক্ষকদের কাছে বিনা পয়সায় তারা তাকে পড়িয়েছেন।
 অনেক কষ্ট,অনেক পরিশ্রমের পর রুমনা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে স্পকিং ইংলিশ কোর্স শিখে একটা নার্সিংহোমে রিসেপশনিষ্টে কাজ পেয়ে যায় আর প্রাইভেটে গ্র্যাজুয়েশনটা করার চেষ্টা করতে থাকে। মাকে দুটো বাড়ির রান্না ছাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। ছেলের মাধ্যমিক রেজাল্টও খুব ভালো হয়। রুমনা এখন একটা সরকারি হাসপাতালের ক্লাক।আর ভাইকে এডুকেশন লোন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াচ্ছে। রেখা এখন সব বাড়ির রান্নার কাজ ছেড়ে দিয়েছে। বাড়িতেই থাকে সব সময়।মেয়েকে বিয়ের কথা বললে বলে," ভাই পড়াশুনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার পর ভেবে দেখবো।"
  সময় তো বসে থাকে না। যতই বিপদ আসুক না কেন ভয় না পেয়ে এগিয়ে চলার একটা বিকল্প রাস্তা খুঁজে নিতে পারলে জীবনটা কারো থেমে থাকে না।

 

Sunday, November 27, 2022

শান্তি খুঁজে নিতে হয়

শান্তি খুঁজে নিতে হয়

 সংসারের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করেও কারো মন রাখতে পারেনি কোনদিন সুষমা।অথচ মিষ্টি স্বভাবের এ মেয়েটির এরকম হওয়ার কথা ছিল না। মেধাবী সুষমা বিটেক করেই চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল। বিয়েতে তার মত ছিল না মোটেই।বাবা,মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার ফলে ওর মনের মধ্যে একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল ও যদি শ্বশুরবাড়ি চলে যায় তাদের কে দেখবে? তাই বিয়ে করার মানসিকতা তার কোনদিন ছিল না। কিন্তু বাবা,মা কী আর সে কথা শোনেন? মেয়ে সন্তান তাকে তো বিয়ে দিতেই হবে। চাকরি পাওয়ার ছয়মাস থেকেই শুরু হয় মায়ের ঘ্যানঘ্যানানি। অফিস,বাড়ি আর মাকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য বাকি সময়টুকু সংসারের কাজ।
  ভীষণ মিশুকে, হাসিখুশি, সংসারী মেয়েটাকে আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশী সকলেই খুব ভালোবাসে।পরিবারের চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতেই হল।সুফল একজন উচ্চপদস্ত ব্যাংক কর্মচারি। সংসারে পা দিয়েই সুষমা বুঝে গেলো স্বামী,শ্বশুর,শ্বাশুড়ী, দেওর আর ডিভোর্সী ননদ সকলের কথা শুনেই তাকে চলতে হবে তা না হলে অশান্তি অবশ্যম্ভাবী।স্বামী, দেওর, ননদ ,শ্বশুর সকলেই চাকরি করেন।সংসারে তারা কুটোটি নাড়েন না। শ্বাশুড়ী একার হাতেই সংসার সামলান। সকলেই অফিস থেকে ফিরে টায়ার্ড থাকেন। তাই কেউই তাকে সংসারের কাজে সহায়তা করে না।
  বিয়েতে মাসখানেক ছুটি নিয়েছিল সুষমা। তাই বৌভাতের পর সমস্ত আত্মীয়স্বজন চলে যাওয়ার পর শ্বাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে থেকে বুদ্ধিমতী সুষমা বুঝে যায় পরিবারের কার কখন কোনটা দরকার। যার যা কিছুই সে তার হাতের কাছে পৌঁছে দিক না কেন কেউই কখনোই সাধারণ একটা ধন্যবাদও ছুঁড়ে দেয়নি কোনদিন। বরং একটা কাজ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে অন্য আর একটা কাজের অর্ডার দিয়ে দেয়।সবকিছুই সে হাসিমুখে পালন করতে থাকে। জোর করে শ্বাশুড়ীকে রান্নাঘর থেকে ছুটি দেয়।মনেমনে ভাবে ছুটি ফুরালে তো তাকেই আবার রান্নাঘরে ঢুকতে হবে।তাই এ কটাদিন যাতে তিনি একটু বিশ্রাম পান সেই চেষ্টায় সে করে।
 কিন্তু কাল হল তার শ্বাশুড়ীকে বিশ্রাম দেওয়ার চেষ্টাটা করা। ছুটি ফুরিয়ে গেলে অফিসে যাওয়ার আগের দিন থেকেই শুরু হল চাপা গুঞ্জন।সংসারের এত কাজ কে করবে? ভাবখানা তাদের এমনই যেন এই সংসারে এ যাবৎকাল সুষমা ই সব কাজ করে এসেছে। ভোরবেলা উঠে যতদূর পারে রান্না করে সকলের অফিসের টিফিন গুছিয়ে নিজেরটা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ননদ বলে উঠলো,
-- বৌদি, আজ কিন্তু আমি রাতে ভাত খাবো না ,আমার জন্য রুটি কোরো।
 সুষমা সে কথার কোন জবাব দিলো না দেখে শ্বশুর বললেন,
--- তুমি শুনতে পাওনি রমা কী বললো?
--- হ্যাঁ বাবা শুনেছি কিন্তু এখন তো অফিস যাচ্ছি আগে বাড়ি ফিরি তারপর এসব ভাববো।
 উত্তর শ্বশুরের পছন্দ হল না সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা গেলো।
 অফিস থেকে বাড়িতে ফিরেই সেদিন থেকে শুরু হল রান্নাঘরে ঢোকা। তারপর রাতের সমস্ত কাজ সেরে যখন সে ঘুমাতে যায় তখন স্বামীর আদর মনেহয় অত্যাচার।প্রথম প্রথম মুখ বুজে স্বামীর সোহাগ মেনে নিলেও পড়ে তাদের দূরত্ব বাড়তে লাগে।অবশেষে মায়ের চেষ্টায় সর্বক্ষণের একজন মহিলাকে বাড়িতে কাজের জন্য রাখে। প্রথম প্রথম সকলের আপত্তি থাকলেও পড়ে এটাতে তারা সুবিধায় পেয়ে যায়।আর মাইনেটা তো সুষমা দেয়। একমাত্র এই মহিলাই সুষমার কষ্টটা বোঝে।সুষমা কিছু করতে গেলেই হাত থেকে কাজ ছিনিয়ে নেয়। তবুও সুষমা সকালে অফিস যাওয়ার আগে আর অফিস থেকে ফিরেও ওই মহিলার হাতে হাতে কাজ করতে থাকে।রাতের খাবারটাও সেই দেয়।অথচ বাড়িতে যে চাকুরীরত ননদ রয়েছে সে এক গ্লাস জল ভরেও খায় না। সেটা কারোই চোখে লাগে না।কিন্তু অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে সে একটু শুয়ে থাকলেও সকলের মুখ ভার হয়ে যায়। তবে সুফল এখন অনেকটাই বোঝে সুষমাকে। কাজের মহিলাটি রাখার ফলে সুষমাও রাতে তার আদরে সাড়া দেয়।তাই তার মেজাজটাও থাকে ফুরফুরে। আর শ্বাশুড়ী মা ? তিনি তো একবার আরামের স্বাদ পেয়েছেন তাই ভুলেও রান্নাঘরে তিনি ঢোকেন না। তবে ভুল ধরতেও তিনি ছাড়েন না। কিন্তু সুষমা কখনোই কারো কথার উত্তর কোনদিন করে না। বুদ্ধিমতী সুষমা একটা কথা বেশ ভালোভাবেই জানে সকলকে নিয়ে চলতে গেলে সকলের সব কথার উত্তর দিলে নিজেরই মানসিক শান্তি নষ্ট হবে।কতটুকু সময়ই বা সে বাড়িতে থাকে? নিজেকে ভালো রাখতে গেলে ছোটখাটো ঝামেলা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।


Friday, November 11, 2022

ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ

ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ

   অভাবের সংসারেও ভাবভালোবাসা ছিলো -
  আসলে চাহিদা আর মনের উপরেই নির্ভর করে মানুষের সুখ। অভাব কিংবা একটু কম ভালোবাসা থাকলেও বিশ্বাসের ভীতটা যদি মজবুত থাকে সেখানে সুখের কোন কমতি থাকে না। ভাবভালবাসা আছে মানেই পরস্পরকে সব সময় গদগদ হয়ে থাকতে হবে তা মোটেই নয়।
 সোনালী ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সোমেশকে। বড় লোকের মেয়ে না হলেও সোমেশদের থেকে তাদের অবস্থা ছিল ভালো। তাই স্বাভাবিক কারণেই সোনালীর মা,বাবার ছিল এ বিয়েতে আপত্তি। তিনবোনের মধ্যে সোনালী ছিল মেজ। বড়জনের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছিলো। সোনালী বাড়িতে নানান অশান্তি সহ্য করতে করতে গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করে। ইতিমধ্যে সাধারণভাবে সোমেশও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে একটা কোম্পানিতে জয়েন করে। সোনালী বাবা,মায়ের অমতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সোমেশকে বিয়ে করে।
  সোমেশ আর তার মা। ছোট্ট দুটো ঘর। কোনরকমে একটা রান্নার জায়গা। দেড়কাঠা জমির উপর ছোট্ট একতলা একটা বাড়ি হলেও সুন্দর সাজানোগুছানো এবং বাড়ির পিছনে অল্প একটু ফাঁকা জমি যেখানে সোমেশের মা লাউ,বেগুন,লঙ্কা ,সিম ইত্যাদি সবজি চাষ করেন।খুব ভালোবাসেন তিনি বাগান করতে। সোনালী সেই পরিবারে এসে প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে তার বেশ কষ্ট হয়েছে। কিন্তু সোমেশের প্রতি অদম্য ভালোবাসা তার মনে কখনো কোন কষ্টকে কষ্ট মনে হয়নি। 
 সোনালী অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তার শ্বাশুড়ির মন জয় করে নেয়। খুব ভালোবাসেন মৃন্ময়ীদেবী সোনালীকে। নিজের মেয়ের মতোই তিনি তার ছেলের বউয়ের সাথে তুই করে নাম ধরে ডেকেই কথা বলতেন। সোনালীও তার শ্বাশুড়িমাকে নিজের মায়ের মতই তুমি করে কথা বলে।
  সংসারে অভাব থাকলেও ভালোবাসার কমতি ছিল না মোটেই। কিন্তু বছর খানেক পরে হঠাৎ করেই সোমেশের চাকরিটা চলে গেলো। সংসারে তখন চরম অভাব। সকলে মিলে পরামর্শ করে সোনালী আর সোমেশ কিছু টিউশনি করতে শুরু করলো। কিন্তু এই সামান্য টাকায় তো আর সংসার চলে না। সোমেশ আর সোনালী দু'জনে মিলেই তখন যেমন-তেমন একটা কাজ খুঁজতে শুরু করলো। একটা কাপড়ের দোকানে সোনালী সেলসের একটা কাজও পেয়ে যায়। এইভাবে কিছুদিন চলার পর সোমেশ আবার অন্য একটি কোম্পানিতে সেই একই মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজ পেয়ে যায়। সংসারটা তখন আবার অনুখাতে চলতে শুরু করে। এই যে সংসারের অর্থের উঠাপড়া তাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব পড়তে কেউই দেয়নি।যেদিন যেমন জুটেছে সেদিন সেই সামান্য খাবারই তিনজনে ভাগ করেই খেয়েছে ; সেখানে কারো কোন অভিযোগ ছিলো না। সংসারে ভালোবাসার বন্ধনটা যদি বিশ্বাসের ভীত দ্বারা তৈরি হয় কোন অভাব সেখানে বাসা বাঁধতে পারে না।
  আস্তে আস্তে সোমেশের পদোন্নতি হয়েছে।সংসারের শ্রীবৃদ্ধির সাথে সাথে ছোট্ট এক লক্ষীর আগমন ঘটেছে।  তাকে নিয়েই পরিবারের বাকি তিনজন হাসি,আনন্দেই দিন কাটিয়ে দেয়। কোন কারণে কোন অশান্তি সোনালী সোমেশের সংসারে প্রবেশ করতে পারে না ।

Monday, November 7, 2022

আইবল

আইবল 

  লুকিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম --- ব্যাস আর যায় কোথায়? বরবেশি কুন্তল তখন চোখ বড় বড় করে আমাদের একের অন্যের গায়ের উপর পড়া দেখতেই ব্যস্ত। আর সুমিত্রা ফুলশয্যার খাটে বসে আমাদের দেখে হেসেই অস্থির।
 ঘটনাটা খুলেই বলি। কলেজ লাইফ থেকেই আমাদের পাঁচজনের একটা দল ছিল। আমি মানে ছন্দা, কুন্তল, সুমিত্রা, শ্রাবন আর দেবেশ। আমার সাথে প্রেম পর্ব শেষ করে, না শেষ করে নয়; প্রেম চলতে চলতেই  বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করে ফেলে শ্রাবন।দেবেশের বিয়ে হয় সম্মন্ধ করে। কুন্তল আর সুমিত্রার বিয়েটাই সকলের শেষে!আগে ছিলাম বন্ধু পাঁচজন এখন ছ'জন। দেবেশের বউ রিয়া একটু চুপচাপ হলেও দলের মধ্যে থাকলে তার নীরবতা ভাঙার জন্য সবাই প্রস্তুত।
  দেবেশের ফুলশয্যার রাতে আলমারির পিছন থেকে কুন্তলকে বের করা হয়েছিল। তারজন্য আলমারিটাকে একটু সামনে টেনে আনা হয়। লাইট অফ করে যখন দেবেশ খাটের উপর গিয়ে বসে ঠিক সেই মুহূর্তে দেবেশের ফোন বেজে ওঠে। খুব বিরক্ত হয়ে দেবেশ তার জামাইবাবুর ফোনটা রিসিভ করে জানতে পারে বন্ধুদের মধ্যে কুন্তলকে দেখা যাচ্ছে না। সে যেন ঘরের ভিতর ভালোভাবে দেখে তারপর লাইট অফ করে। ফোনে কথা শুনেই এক লাফে উঠে গিয়ে দেবেশ ঘরের লাইট জ্বালিয়ে চিরুনি তল্লাশী শুরু করে। জামার কলার ধরে কুন্তলকে আলমারির পিছন থেকে টেনে বের করে আনে।
 আজ প্রতিশোধ নেওয়ার পালা।সবাই যখন বৌভাতের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত দেবেশ তখন আমাকে আর শ্রাবনকে নিয়ে এসে এক ফাঁকে কুন্তলের ঘরের দরজার আইবল খুলে রেখে যায়। দেবেশের মিসেস তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে যায় কারণ সে প্রেগন্যান্ট। 
  সব কাজকর্ম শেষের পড়ে সবাই মিলে কুন্তলকে ঘরে ঢুকিয়ে টাটা, বাইবাই, কাল সকালে দেখা হবে , বেশি রাত জাগিস না - ইত্যাদি নানান কথা বলে যে যার মত পিছন ফিরে চলে যায়। 
 কুন্তল ,সুমিত্রা দুজনেই ভাবে এত তাড়াতাড়ি ওদের চলে যাওয়ার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। ওরাও দু'জনে বসে বসে অনেকক্ষণ গল্প করতে থাকে। ঘরে যত রকম ফার্নিচার আছে সেগুলোর পিছন, তলা সব দেখেশুনেও কাউকেই তারা খুঁজে পায় না। শেষে কুন্তল আইবল দিয়ে বাইরে দেখতে গিয়ে দুটো বড় বড় চোখ দেখে ঝটপট দরজা খুলে ফেলায় দেবেশ, শ্রাবন আর আমি পরপর তিনজন পুরো কুন্তলের দরজার কাছে একের উপর আর একজন করে তিনজনেই ভূপতিত।
 হাহা ,হিহি কিন্তু কেউ সেখান থেকে ওঠে না। তখন সুমিত্রা খাট ছেড়ে নেমে এসে আমার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে বলে
-- আরে তোরা তো আমাদের বলতে পারতিস আমরা একটা বড় হলরুম বাইরে কোথাও ভাড়া নিয়ে একঘরেই থাকতাম সবাই। 
 কোমর কাত করতে করতে দেবেশ আর শ্রাবন উঠে দাঁড়িয়ে একসাথেই বলে উঠলো,
--- ঘাট হয়েছে।আমাদের।এই আমরা চললুম।
-- এই তার আগে আমার আইবলটা লাগিয়ে দিয়ে যা।
  দেবেশ আর শ্রাবন তখন আইবল লাগাতে লাগলো।


Tuesday, October 18, 2022

সহজে মানুষ চেনা যায় না



  সহজে মানুষ চেনা যায় না( আলো আঁধার)

  প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম সম্রাটকে। দাদার বিয়েতে প্রথম দেখা। লতায়পতায় সম্পর্কে বৌদির ভাই। দাদার বিয়ের পর নানান সূত্রে তার সাথে দেখা হত। আমি তখন সবে মাধ্যমিক দেবো।আর সম্রাট উচ্চমাধ্যমিক। আমার এই ভালো লাগাটা সম্রাট বুঝতে পেরেছিল কিনা আমি জানিনা। তবে সে একদিন ঠিক সুযোগ বুঝে তার মনের কথাটা আমায় জানিয়েছিল।
 সম্রাটের মুখে ' ভালোবাসি ' কথাটা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেছিলাম।ও হঠাৎ করেই আমার হাত ধরে বলেছিল,
--- দিদির বিয়েতে প্রথম দেখে তোমায় খুব ভালো লেগেছিলো। সেই থেকে ভালোলাগাটা  একটু একটু করে কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। অনেকদিন ধরেই কথাটা তোমায় বলবো ভাবছি কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। 
 আমি তো তখন লজ্জা আর ভালোলাগা মিশিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি। কোন রকমে চোখ তুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে পালালাম। সেই শুরু।
 সম্রাটকে যেমন দেখতে,পড়াশুনায়ও ঠিক তেমনই। সম্রাট যখন কথা বলে তখন ওর গলার আওয়াজ আমার কাছে এতটাই ভালোলাগে আমি মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়েই থাকি। সুন্দর গান করে, আবৃত্তি করে। যাকে বলে অলরাউন্ডার। 
  একটু একটু করে সম্রাট আর আমার ভালোবাসার পাঁপড়ি মেলতে শুরু করলো। আমিও নেহাৎ মন্দ ছিলাম না পড়াশুনায়। সম্রাট যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ভালো চাকরি পেয়ে গেলো আমিও কিছুদিনের মধ্যে একটা প্রাইভেট ফার্মে ঠিক চাকরি যুঠিয়ে নিলাম।
 দুই বাড়ির মতেই বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো। স্বপ্নের মত দিনগুলি চলে যেতে লাগলো। 
 নিজের ভাগ্যের প্রতি মাঝে মাঝে নিজেরই হিংসা হত। বিয়ের ঠিক দুবছরের মাথায় সুইজারল্যান্ডে সম্রাটের বিশাল চাকরির অফার। আমি রাজি থাকলেও আমার বাড়ি কিংবা সম্রাটদের বাড়ির কেউ রাজি ছিলো না সম্রাটের এই চাকরি অ্যাকসেপ্ট করার। কিন্তু আমার ও সম্রাটের যেহেতু দু'জনেরই মত আছে তাই কারো অমতই ঢপে টিকলো না। সম্রাট সুইজারল্যান্ড চলে গেলো। ছ'মাস পড়ে এসে আমায় সাথে নিয়ে যাবে। প্রতিটা মুহূর্তে চোখ বুঝে সুইজারল্যান্ডের মাটিতে দু'জনের সুখী জীবনের স্বপ্ন সফল করে চলেছি। রোজই সম্রাটের সাথে ফোনে কখনো ভিডিও কল কখনো বা এমনিই কথা হয়।
  ঠিক একবছরের মাথায় সম্রাট আমায় নিতে আসে।কিন্তু তার আগে অনেকবার ফোনে তার সাথে আমারo ঝামেলা হয়ে গেছে। এখন সে রোজ ফোন করে না, করলেও অল্প সময় কথা বলে। আগের সেই উৎফুল্লতা,আবেগ,অনুভূতি সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। 
  সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে মন দিয়ে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আমি যখন ব্যস্ত তখন প্রতি মুহূর্তে সম্রাটের ভিতর আমূল পরিবর্তন দেখতে পাই। মাঝে মধ্যেই নেশায় বুদ হয়ে ঘরে ফেরে। কোথায় তার গান,কবিতা? সবকিছু তার জীবন থেকে তো বটেই আমার জীবন থেকেই একটু একটু করে সম্রাট হারিয়ে যেতে থাকলো। নিত্য নতুন নারী সঙ্গ যে তার জীবনে আসছে তা তার গতিবিধি দেখেই বুঝতে পারতাম। অনেক বুঝিয়েছি ; মানাভিমান, ঝগড়াঝাঁটি করেও কোন ফল হয়নি। জীবনে হঠাৎ করে অতিরিক্ত অর্থ সম্রাটের জীবনটাই শেষ করে দিলো। ভালোবাসায় যে আলোর দিশা সম্রাটের ভিতর দেখতে পেয়েছিলাম তা হঠাৎ করেই অন্ধকারে ঢেকে দিলো।সম্রাটের কাছে টেকাই আমার দায় হয়ে পড়ল।শেষে বাড়ির সাথে যোগাযোগ করে একদিন সম্রাটকে না জানিয়েই পুনরায় কলকাতা ফিরে আসা।

    

Saturday, October 15, 2022

ভাগ্যরেখা



 ভাগ্যরেখা      (সুখ - দুঃখ)

  জীবনটা শুরু হয়েছিল একভাবে। তখন ভেবেছিলাম নিজের জীবন নিজেই গড়ে নিতে পারবো। পড়াশুনায় ভালো ছিলাম, বাবার আর্থিক ক্ষমতা ছিল। লোকে আমাকে সুন্দরী, বুদ্ধিমতীই বলতো। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক।সবই ঠিকঠাক চলছিল। মাধ্যমিকে বেশ কয়েকটি লেটার নিয়ে পাশ করলাম। বাবার আমাকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল।শুধু বাবা কেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও আমাকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না। নিজের ইচ্ছা এবং বাবার দেখানো স্বপ্ন নিয়ে ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতাম। জীবন ছিল সুখী,সচ্ছল,উচ্ছল।
  কিন্তু এ সুখ আমার কপালে বিধাতা লিখেছিলেন সাময়িক। ভাগ্য লেখার দোয়াত-কলম যে ছিল তার হাতে। শুরুতে তিনি আমাকে সবকিছু দিয়েও আচমকা সবকিছুই কেড়ে নিলেন। উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার আগেই হঠাৎ আসা ঝড়ে সব তছনছ করে দিলো। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন বাবা। জীবনের মোড় ঘুরে গেলো অন্যখাতে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন গেলো ভেঙ্গে। একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে দেখা দিলো ফাটোল। বাবা পরিবারের মেজ ছেলে হলেও যেহেতু ভালো চাকরি করতেন কাকা,জ্যাঠার থেকে তিনি বেশি সংসার খরচটা দিতেন। অন্যান্যরা সংসারের পিছনে খুব একটা অর্থ খরচ করতেন না। ভাইদের মধ্যে মিল ছিল ভীষণ।
   কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো সবই ছিলো বালির বাঁধ।বলতে গেলে যেহেতু বাবার টাকায় সংসারটা চলতো তাই সকলেই বাবার কথা শুনে চলতেন। উপর উপর সকলেরই একটা মিষ্টির প্রলেপ দেওয়া ছিল।
  বাবার সমস্ত কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই একদিন সকলের হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেলো। আমি, মা আর ভাই। কী করে কী হবে ভেবে ভেবে দিনরাত মা আর আমি প্রায় পাগল হওয়ার পথে। পেটে বিদ্যা কম তাই টিউশনি করেও বিশেষ কোন লাভ হয় না।তবুও নিজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা পড়াতে শুরু করলাম। একটা একটা করে মায়ের গয়না বিক্রি হতে লাগলো। 
  চরম দরিদ্রতার ভিতর উচ্চমাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করলাম। কিন্তু জয়েন্টে বসার মত আর্থিক সামর্থ না থাকায় অঙ্কে অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। তখন মায়ের গয়নাও শেষ।ভাই তখনো মাধ্যমিক দেয়নি। পড়াশুনা আমার বন্ধ হওয়ার পথে তখন। সবকিছু শুনে পাড়ার ক্লাব আর স্কুলের কয়েকজন শিক্ষকের সহয়তায় আমি কলেজে ভর্তি হলাম অঙ্কে অনার্স নিয়ে।
  আমি যখন দ্বিতীয় বর্ষ তখন মা চলে গেলেন আমাকে আর ভাইকে ছেড়ে। ভাই তখন সবে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। পাড়ার কিছু সহৃদয় ব্যক্তি,কয়েকটি ক্লাব আর স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সহয়তায় আমি বেশ ভালোভাবেই পাশ করে গেলাম। জীবনের প্রতি পদেপদে ঠোক্কর খেতে খেতে যখন এই জায়গায় এসে দাঁড়ালাম তার ঠিক তিন মাসের মাথায় ওই কলেজেই আমি পার্টটাইম জব পেয়ে গেলাম স্যার আর ম্যামদের সহায়তায়। 
  বছর দুয়েক বাদে আমার চাকরিটা পার্মানেন্ট হয়।ভাই এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। জীবনে সব আশা পূরণ না হলেও একটা জায়গায় এসে আজ দাঁড়াতে পেরেছি। কিন্তু যে দুটো মানুষ বেঁচে থাকলে সব থেকে খুশি হতেন তারাই আজ আমার জীবনে নেই। মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হলেও ভাইকে নিয়ে সব কষ্ট ভুলে ভালো থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আমাকে যেতেই হবে।
 

Friday, October 14, 2022

শুধু ভালোবাসি

শুধু ভালোবাসি

ভালোবাসা যায় এভাবেও --- 
 যা পাইনি রিয়া তা নিয়ে প্রথম প্রথম ভীষণ দুঃখ ছিল,কষ্ট ছিল। কিন্তু জানো এক সময় নিজেই উপলব্ধি করলাম আমি তো তোমায় ভালবাসতাম, তাহলে তোমায় নিজের করে পাইনি বলে আমার এত কষ্ট কেন হচ্ছে? প্রতিদিন তোমার খবর পাচ্ছি, ফেসবুকে তোমার ছবি দেখছি। যেহেতু তোমায় ভালোবাসি আমি তো তোমায় সুখী দেখতেই চেয়েছিলাম। সেটাই যদি হয় আমার এই কষ্ট পাওয়ার তো কোন মানেই হয় না। আর ঠিক তখনই তোমাকে নিজের করে না পাওয়ার কষ্টটা আস্তে আস্তে কমতে থাকলো আর তোমার প্রতি ভালোবাসাটা দিনকে দিন বাড়তে থাকলো।
 হ্যাঁ তুমি জানতে চাইতেই পারো আমি কেন বিয়ে করিনি। আসলে আমার জীবনের প্রথম প্রেম ছিলে তুমি। তোমাকে নিয়ে যে স্বপ্নগুলো আমি দেখেছিলাম সেই স্বপ্ন আমি অন্য কাউকে নিয়ে পূরণ করতে গেলে প্রতি পদেপদে ঠোকর খেতাম; তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন অন্যকে দিয়ে কি পূরণ হত বলো? তাই ওই রাস্তায় আমি আর হাঁটিনি। আর ঠিক এইভাবেই তোমাকে ভালোবেসে আমি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো। প্রকৃত ভালোবাসায় শরীর থাকে না থাকে ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসা।
 রিয়া আর সৌম্য একই পাড়ার দুটি কিশোর কিশোরী। ছেলেবেলা থেকেই দু'জন দু'জনের বন্ধু। রিয়া চ্যাটার্জী আর সৌম্য দাস। দু'জনের মিলনের পথে এটাই ছিল প্রতিবন্ধকতা। সৌম্যর বাড়িতে রাজি থাকলেও রিয়ার বাড়িতে এই অসবর্ণ বিয়েতে কিছুতেই রাজি হয়নি। রিয়া সৌম্যকে বলেছিল পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে। কিন্তু সেক্টর ফাইভে কর্মরত মোটা মাইনের চাকরি করা সৌম্য চায়নি রিয়াকে তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। 
 রিয়ার বিয়ে হয়ে যায় বয়সে দশ বছরের বড় স্কুল শিক্ষক সুনীলের সাথে। একটি সন্তান হওয়ার পর সুনীলের হঠাৎ স্ট্রোক হয়।বাম অঙ্গ পুরো অসার হয়ে যায়। তখন রিয়া প্রাইভেট পড়িয়ে ছেলেকে মানুষ করতে থাকে সাথে সুনীলের ব্যয়বহুল চিকিৎসা যা প্রায় অসম্ভব ছিল। পরিণতি বত্রিশ বছর বয়সেই রিয়া সুনীলকে হারায়।
 ছেলে এখন বি.কম করছে। এখন মায়ের মত সেও প্রচুর টিউশনি করে। সৌম্য একের পর এক চাকরি ছেড়েছে ভালো অফার পেয়ে। এখন সৌম্য সুইজারল্যান্ড। বাবা গত হলেও মা এখনো জীবিত। এখনো রোজই ছেলের মাথার পোকা তুলে খান বিয়ে করার জন্য। সৌম্য যখন দেশে ফেরে তখন সে মাকে নিয়েই মাসখানেক কলকাতা তাদের পুরনো বাড়িতে কাটিয়ে যায়।
  ফেসবুকে সৌম্য ,রিয়া বন্ধু থাকলেও কেউ কোনদিন কারো ব্যক্তিগত কথা কারো সাথেই শেয়ার করেনি। কিন্তু দু'জনেই দু'জনের খবর সব জানতো কমন বন্ধুদের মাধ্যমে।এবার দেশে ফেরার আগে সৌম্য জানিয়েই এসেছিলো রিয়ার সাথে দেখা করতে চায়। তাই বহু বছর বাদে পুরনো কফিশপে দু'জনের দেখা।
 কথা হয় কম, নীরবতায় বেশি। নীরবতায় যেন তাদের মনের সব কথা বলে যাচ্ছে। রিয়ার দু'একটি প্রশ্নের উত্তরে সৌম্য যেটুকু বললো রিয়া তাই শুধু শুনে গেলো।
  কথা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দু'জনের বুক চিরে দুটি দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো যা দু'জন এত কাছে থেকেও টের পেলো না নিজেরা ছাড়া!



 
 

লক্ষী বৌমা

  লক্ষ্মী বৌমা 

অবশেষে এলো সেই দিন --
  একার হাতে সবকিছু।সুতরাং আমাকে সেই কাক ডাকা ভোরেই প্রতিদিন উঠতে হয়।শ্বাশুড়ী মা বাতের রোগী।সারাটা রাত তিনি যন্ত্রণায় কষ্ট পান।ভোরের দিকে তাই ঘুমিয়ে পড়েন।সংসারের কোন কাজই তিনি করতে পারেন না। স্বামীর অফিসের তাড়া থাকে।তিনি আটটায় উঠে কোন রকমে স্নান,খাওয়া সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকেন।যেতে আসতেই তার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় চলে যায়। তারপর বাবাইয়ের টিফিন করা, সাড়ে ন'টায় তার বাস আসে তার আগেই তাকে রেডি করে ঠিক সময়ে তাকে নিয়ে ছুটতে হয় বড় রাস্তার মোড়ে। বাসে তুলে দিয়েই দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে ফিরেই সংসারের বাকি কাজে হাত লাগানো।ততক্ষণে শ্বাশুড়ী মা ঘুম থেকে উঠে পড়েন।তার চা,জল খাবার দিয়ে যদি সময় পাওয়া যায় তাহলে বসে টিফিনটা করি নতুবা মুখে খাবার পুড়ে চিবাতে চিবাতে এদিক ওদিক ছুটে কাজ করা।কোনদিন বসে চা টাও খেতে পারিনি।গরম চা প্লেটে ঢেলে তাড়াতাড়ি শেষ করেছি বিয়ের পর থেকে জীবনের এই বেলা পর্যন্ত। তিনটে বাজতেই ছেলেকে আনতে আবার সেই বড় রাস্তায় মোড়ে।
 কাজের লোক কোনদিনও রাখতে পারিনি আর্থিক কারণে।খুব ভালো গান গাইতাম একসময়। পড়াশুনায় ছিলাম মধ্যম মানের।ভেবেছিলাম চাকরির বাজারের যা অবস্থা গান নিয়েই জীবনটাকে গড়ে নেবো।কিন্তু কপাল এমন মন্দ গ্র্যাজুয়েশনের আগেই স্ট্রোক করে বাবা চলে গেলেন চিরতরে।দাদা তখন চাকরি করছে ঠিকই কিন্তু মা আর দাদা দু'জনে মিলে আমার গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট বেরোনোর আগেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেললেন।আমার কোন আপত্তিতে কোনোই কান দিলেন না।
  বিয়ের সাথে সাথেই আমার জীবনে দেখা স্বপ্নগুলো একটা একটা করে ফুলের পাপড়ি ঝরে যাওয়ার মত জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকলো।
  বাড়িতে নূতন বউ হয়ে ঢুকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার শ্বাশুড়ী তার ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ আনেননি এনেছেন একটি কাজের লোক।যে সারা দিনরাত কাজের বিনিময়ে খেতে পরতে পারবে আর রাত হলে তার ছেলের শারীরিক খুদা মেটাবে।আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা, মন্দলাগা কোনকিছুর দাম দেওয়ার মত এদের যেমন কোন মনোভাব নেই ঠিক তেমনই কোন সামর্থ্য কিংবা কোন সুযোগও নেই। তাই সবকিছুই ভাগ্যের দোহাই দিয়ে মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলাম।
 দু'বছরের মাথায় বাবাই আসে আমার কোল জুড়িয়ে।হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে রান্না করে রেখে তবে হাসপাতাল যেতে হয়েছিল।বিয়ের পরদিন থেকেই দেখেছি শ্বাশুড়ী মায়ের বাতের যন্ত্রণায় আহা,উহু করে হাঁটাচলা করতে।সেই অস্তমঙ্গলায় একবার বাপের বাড়িতে গেছিলাম সেই শেষ।আর গেছি মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে।চারদিনের মাথায় ঘরে বসে সামান্য কাজ করেছি কিন্তু মায়ের কাজে সেদিনও বাপেরবাড়ি আমার যাওয়া হয়নি কারণ শ্বাশুড়ী মা তখন এতটাই অসুস্থ্য আমার পক্ষে কয়েক ঘণ্টার জন্যও কোথাও বেরোনো সম্ভব নয়।
  কাকে নালিশ জানাবো ? নালিশ জানানোর যেমন কেউ নেই ঠিক তেমনই জানিয়েও তো কোন লাভ নেই কারণ সবকিছুই তো আমি চোখের সামনে দেখতে পারছি।
  ছেলে বড় হল।ব্যাংকে ভালো চাকরিও পেলো।তখন একটা কাজের লোক জোর করে সে রাখলো মায়ের কষ্ট দেখে।শ্বাশুড়ী মা তখন শুধু শুয়েই থাকেন আর যন্ত্রণায় পুরো বাড়ি মাথায় করেন চিৎকার করতে করতে।ওষুধ,মালিশ কিছুই বাদ নেই কিন্তু তবুও তিনি কোনদিনও বাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি।
  ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করা হল।মেয়ে পছন্দ করে আসার পর ছেলে বললো,
--- বিয়ের আগে একবার ওকে আমাদের বাড়িতে আনা যায় না মা?
--- এ আবার কেমন কথা? বিয়ের আগে কিভাবে বিয়ের কনেকে তার উঠবি স্বামীর বাড়িতে আসার কথা বলবো? তোর দরকার হলে তুই আলাদা করে কথা বল অন্য কোথাও।
 ছেলের বিয়ে হল।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার বৌমা অস্তমঙ্গলা সেরে এসে পুরো রান্নাঘরের দায়িত্ব নিলো।আমাকে কিছুই করতে দেয় না। আমি কিছু করতে গেলেই বলে,
-- মা রান্নাঘরের দায়িত্ব এতদিন আপনি সামলেছেন।এবার থেকে এ দায়িত্ব শুধু আমার।আপনি শুধু ঠাকুমাকে দেখুন।আমিও দেখবো তাকে যখন আপনি পারবেন না।কিন্তু রান্নাঘরে আপনাকে আর আমি কোনদিন ঢুকতে দেবো না।
  স্বামী আমার সব দেখেশুনে বললেন,
--- আমার মনেহয় কি জানো তোমার বুবাই বিয়ের আগেই তার সাথে দেখা করে এ কথা আদায় করে নিয়েছে।যাক কপাল করে ছেলের বউ পেয়েছ বটে!
 তারপর সত্যিই একদিন বুবাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিলাম ওই কারণেই সে বিয়ের আগে রমাকে এ বাড়িতে একবার এনে নিজের চোখে সবকিছু দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ না হওয়ায় ফোনে কন্টাক্ট করে তার সাথে দেখা করে তার একটাই কথা ছিল ,
--- আমার মা সারাটা জীবন পরিশ্রম করেছেন ।অসুস্থ্য শরীরেও রান্না করেছেন।তুমি কি পারবে আমার মাকে রান্নাঘর থেকে মুক্তি দিতে? কয়েক মাসের মধ্যেই আমি রান্নার লোক রেখে দেবো।মাত্র ছ'টা মাস আমি সময় চাচ্ছি।
  এখন রান্নার মাসি,কাজের মাসি সবই আছে আমার ছেলের দৌলতে।শ্বাশুড়ী মা বুবাইয়ের বিয়ের তিনমাসের মধ্যে মারা যান।আজ আমার কোন কাজ আর সংসারে নেই।এই বয়সে এসে আবার হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছি বৌমার পীড়াপীড়িতে।বৌমা আমার সত্যিই লক্ষী।



 

Friday, September 2, 2022

কেউ কারো নয়

কেউ কারো নয় 

কতদিন আর মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে যাবো --

  ব্যালকনি থেকে নন্দিতা উঁকি দিয়ে দেখে গেটের কাছে একটি হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে।ফ্ল্যাটটিতে আটটা পরিবার বাস করে।একমাত্র বীরেনবাবুর ছাড়া আর সকলেরই গাড়ি রয়েছে। বীরেনবাবু আর তার স্ত্রী থাকেন দোতলার পশ্চিম দিকের ফ্ল্যাটটিতে।
  বীরেনবাবু আর তার স্ত্রীর দু'জনেরই বয়স হয়েছে।ছেলে থাকে আমেরিকায়।বছর দু'য়েক আগে এসে বাপের বিশাল তিনতলা বাড়ি বিক্রি করে বাবা,মায়ের জন্য ছোট্ট দু'কামরার এই ফ্ল্যাটটি কিনে দিয়ে বাকি টাকা পয়সা নিয়ে পুনরায় আমেরিকা চলে গেছেন।যদিও স্বামী,স্ত্রী দেখা হলে প্রায়ই বলে থাকেন ছেলে মাসে মাসে টাকা পাঠায় কিন্তু সেটা যে সত্যি নয় এটা ফ্ল্যাটের অনেকেই বুঝতে পারেন।
  মাঝে মাঝে নন্দিতা এটা সেটা রান্না করে যখন তাঁদেরকে দিতে গেছে অধিকাংশ দিনই সে দেখেছে এক তরকারী ভাত করা।প্রথম থেকেই নন্দিতার বয়স্ক এই মানুষ দু'টির প্রতি অদ্ভুত এক মায়া।কেন তা সে নিজেই জানে না।নন্দিতা তার শ্বাশুড়ী ,চার বছরের ছেলে আর স্বামী থাকে তিন তলায়।
  বীরেনবাবুর স্ত্রীর হঠাৎ এই বয়সে এসে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার।যেহেতু নন্দিনী বীরেনবাবুর স্ত্রী ললিতাদেবীকে নিয়ে নিজে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল তাই ললিতাদেবী নন্দিনীকে বলেছিলেন,
--- এই বয়সে এসে মানুষটা একথা জানলে বড্ড কষ্ট পাবেন। তাই মা তুমি এই রোগের কথা ওনাকে কিছু জানিও না।কটাদিনই বা আর বাঁচবেন আর আমারও তো সময় শেষ।
 নন্দিনী ললিতাদেবীর কথা রেখেছে। সে শুধু বীরেনবাবু কেন ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদেরও অনেকদিন পর্যন্ত কিছু বলেনি।নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া, ওষুধপত্র কেনা সবই নন্দিনী করে। নন্দিনী বয়স্ক ভদ্রলোকটিকে নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে বানিয়ে বানিয়ে ডাক্তার এই বলেছেন,ডাক্তার ওই বলেছেন - বলতে বলতে নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দু থেকে তিনবার বীরেনবাবুর ফ্ল্যাটে নন্দিনীকে যেতেই হয়। 
  যেহেতু শ্বাশুড়ী আছেন এবং তিনি বীরেনবাবুদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাই সব সময়ই তিনি তার বৌমার এই কাজকে সমর্থন করে গেছেন।
  আগেরদিন অনেক রাত পর্যন্ত বীরেনবাবুর শরীর খারাপ হওয়াতে নন্দিনী ওদের ফ্ল্যাটেই ছিল।তার আগেই সন্ধ্যার দিকে ললিতাদেবীকে নিয়ে নার্সিংহোম ভর্তি করতে হয়েছে প্রচণ্ড শরীর খারাপ হওয়াতে।বীরেনবাবু চোখে খুবই কম দেখেন। মোটা পাওয়ারের চশমা পরেও সবকিছু আবছা দেখেন।চোখে ভালো দেখতে পেলে তিনি দেখতে পেতেন কিংবা জানতে পারতেন এক একটা গয়না বিক্রির টাকায় এক একটা কেমো নেওয়ার ফলে তার লালির মাথায় এখন একটাও চুল নেই।
  সেদিন যখন নন্দিনী বীরেনবাবু অসুস্থ্য হলে বাড়িতে ডাক্তার দেখে এনেছিল তখন ডাক্তারবাবুর সাথে কথা প্রসঙ্গে বলছিলো, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভদ্রলোককে এতদিন ঠিক রেখেছিলাম।কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হলেও কানটা তো ঠিক আছে।মাসিমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় পাশের ফ্ল্যাটের দু'জন ভদ্রলোকের কানাঘুষো শুনে উনি জেনে যান মাসিমার রোগের কথা।তারপর থেকেই এই অবস্থা।
  বীরেনবাবু রাতে দরজা বন্ধ না করে শোয়ার ফলে সকালে দুধ দিতে এসে ছেলেটি ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে বীরেনবাবু মেঝেতে পড়ে আছেন।চিৎকার করে লোক জড়ো করে।সেই সময় নিচুতে একটি ট্যাক্সি তার চালক পরিষ্কার করছিলো।সেও ছুটে আসে।
 রাত করে ফেরার ফলে ঘুম থেকে উঠতে নন্দিতার একটু দেরি হয়।কিন্তু ওই ট্যাক্সি আর সিঁড়িতে অসংখ্য পায়ের শব্দ শুনে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে চলে যায় সেখানে।গিয়ে দেখে সব শেষ।বীরেনবাবু আর নেই।ততক্ষনে ফ্ল্যাটের অপর এক বাসিন্দা যিনি পেশায় ডাক্তার তিনি জানিয়ে দেন বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি এ নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছেন।
  বীরেনবাবুর ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগে নন্দিনী ফোনটা নিয়েই গেছিলো কিছুটা বিপদের আঁচ পেয়ে।ঠিক তখনই নার্সিংহোম থেকে ফোন করে নন্দিনীকে জানিয়ে দেওয়া হয় ভোর চারটে নাগাদ ললিতাদেবী পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন।
  ফ্ল্যাটের লোকেরা তার ছেলেকে জানানোর ফলে সে জানিয়ে দেয় তার পক্ষে আসা কিছুতেই সম্ভব নয় এখন। দুটি দেহ চাঁদা তুলে সৎকার করা হয়।


  
    

অতীত শুধু ভাবনায় মানায়

জীবনে দেখা স্বপ্নগুলো কোনটাই পূরণ হল না নন্দিনীর। নিজেকে নিয়ে যখন ভাবতে বসে তখন বুকটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। অথচ পড়াশুনায় বেশ ভালই ছিল সে,চেহারাও খারাপ ছিল না।কিন্তু ভাগ্য! সবকিছু থাকা স্বর্তেও ভাগ্যের বিরম্বরায় জীবন যুদ্ধে পর্যুদস্ত সে। কিশোরী বয়সে ভালোলাগার কথা সেই মানুষটাকেই কোনদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি। বাবার পছন্দ করা ছেলেকে পড়াশুনার মাঝপথে বিয়ে দেওয়ার ফলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটুকুও ধুলিৎসাত হয়ে যায়।
 দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ে যখন নিজের মনকে শক্ত করে নিয়েছে ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করেই বিমলের চলে যাওয়া। লড়াইয়ের রাস্তাটা তখন আরো বন্ধুর হয়ে পড়ে। লড়াইটা তখন নন্দিনীর একার কাছে আরো কঠোর হয়ে ওঠে।মেয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তার বিয়ে দিয়ে ছেলের উচ্চশিক্ষার আর্থিক দিক থেকে যখন জর্জরিত ঠিক তখনই ফেসবুকের সূত্র ধরে তার জীবনে নূতন করে ঝড় তোলে কিশোরীবেলার সেই ভালোলাগা। 
 পুরনো অনেক কথার ভিড়ে ফোনালাপেই মনের অনেক কাছে চলে আসে তারা। কোন চাহিদা ছাড়াই নন্দিনী বাঁচার একটা রাস্তা খুঁজে পায়। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে কিশোরকে তার ভালো লেগেছিলো জীবনের শুরুতে, তার এখন আমূল পরিবর্তন! 
  নন্দিনী যে তার জীবনে শুধুমাত্র একটা সময় কাটানোর যন্ত্র সৌমেনের কথাবার্তায় সে কোনদিনও বুঝতে পারেনি।বেশ কয়েকমাস কেমন একটা নেশার মত পেয়ে বসেছিলো নন্দিনীর। সৌমেন যেহেতু নির্দিষ্ট সময় ধরে ফোন করতো তাই ওই সময়টা নন্দিনী সব কাজ শেষ করে ফোনের অপেক্ষাতেই থাকতো। সৌমেনের সাথে কথা বলতেই ভালো লাগতো নন্দিনীর। নন্দিনী জানতো সৌমেন বিবাহিত,স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সে খুব সুখী। সুতরাং নন্দিনীর অন্য কোন চাহিদা সৌমেনের কাজ থেকে ছিল না; শুধু মাঝে মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে একটু কথা বলা। এই কথা বলার মধ্যেই নন্দিনী ফিরে পেয়েছিল তার হারানো শৈশব।
 কিন্তু হঠাৎ করেই সৌমেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে।সৌমেনের কথাবার্তায় নন্দিনী বহুবার বুঝতে পেরেছে সে যতটা সুখী হওয়ার ভান করে ততটা সুখী সে নয়, সেও বোধহয় এইভাবে হঠাৎ পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে ভালো থাকে।কিন্তু বউকে যে মারাত্মক ভয় পায় আর হয়ত এই ভয় পাওয়ার কারণ থেকেই কোনকিছু ঘটায় সে নন্দিনীকে ফোন করা মোটামুটি বন্ধই করে দেয়। 
 হঠাৎ করে এই বয়সে এসে বিনা কারণে এত বড় একটা আঘাত নন্দিনী কিছুতেই নন্দিনী মেনে নিতে পারে না।তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। কারণ সৌমেনের কাছ থেকে তার কিছুই চাওয়ার ছিল না। সৌমেন সরাসরি যদি তাকে কারণটা জানিয়ে সরে যেত তাহলে নন্দিনীর এতটা খারাপ লাগতো না।কারণ সেও চায় না তার কারণে সৌমেনের সংসারে কোন ক্ষতি হয়। এক্ষেত্রে নন্দিনীর মনে হতে লাগলো "অপরাধী জানিল না কি তার অপরাধ বিচার হইয়া গেলো" -। 
 নিঃসঙ্গ জীবনে সৌমেন দমকা হাওয়ার মত বেশ কিছুদিন নন্দিনীর জীবনে ফ্রেস অক্সিজেন হয়ে এসেছিলো। নন্দিনী সৌমেনের না বলা সত্ত্বেও তার অসুবিধাগুলো বুঝতে পেরেই তাকে ব্লক করে দেয়। জীবন যুদ্ধে আরো একবার পরাজয় নন্দিনীর!
 তবে এই ঘটনা থেকে নন্দিনী একটা কথা বুঝতে পারে আর তা হল অতীত অতীতেই থাকা ভালো ,সুযোগ পেলেও তাকে কখনোই সামনে আনা উচিত নয়। তাতে কষ্ট বাড়ে বৈ কমে না।অতীত থাক মননে আর ভাবনায়। শুধুমাত্র অবসরে একান্তে তাকে ভাবলে অন্তত মানসিক কিছুটা তো তৃপ্তি আসবে। সুযোগ পেলেও অতীতকে গ্রহণ না করায় ভালো।