Friday, November 12, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (চৌদ্দ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (চৌদ্দ পর্ব)
  হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে হঠাৎ করেই এক দাঙ্গা শুরু হল।চারিদিকে পরিচিত অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর আসতে লাগলো।অমরেশবাবু সারাজীবনই নিরীহ এবং খুবই শান্তি প্রিয় মানুষ।বহু মানুষের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও যেহেতু উকালতি ছিল তার পেশা এবং গ্রামের যে কোন মানুষ বিপদে পড়লেই ঝামেলা, পুলিশ, কোর্ট পর্যন্ত গড়ালেই যে আগে তার কাছে ছুটে আসতো তিনি তার পক্ষ নিয়েই কেস লড়তেন।সে বাদী বা বিবাদী যে কোন পক্ষই হোক না কেন।
 উকালতি জীবনে নিজের পক্ষকে জিতিয়ে দেওয়ার তাগিদে প্রত্যেক উকিলই সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য - এটাই তাদের কাজ।উকিলদের ( তখনকার দিনে মোক্তারদেরও) প্রফেশনই এটা।যে যত তার কথার মারপ্যাঁচে জজকে বোঝাতে পারবেন তিনিই হবেন জয়ী।
  শেখ আহম্মদ আলী খোকনের বিরুদ্ধে একবার একটি কেস তিনি লড়েছিলেন। কেসটি ছিলো এইরূপ - একজন ব্যক্তি তার মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে শহরে এসে কিছু জমি বিক্রি করে সেদিনই তিনি তার মেয়ের বিয়ের গয়না কিনে এবং কিছু ক্যাশ টাকা নিয়ে নৌকা করে তার বাড়ি ফিরছিলেন।সেই সময় নৌকায় ডাকাত পরে।ডাকাতরা নৌকায় উঠেই প্রথমে যে হারিকেন নৌকায় জ্বালানো ছিল সেটি তারা ভেঙ্গে ফেলে।কিন্তু ডাকাতদের তারা চিনতে পারে এবং তাদের নাম উল্লেখ করেই তারা কেস দেয়।সেই কেসে ওই ডাকাতদের মধ্যে খোকনের নামটাও থাকে।আর অমরেশবাবু ছিলেন ওই ডাকাতদের পক্ষের উকিল।
 এমতাবস্থায় কেস লড়তে গিয়ে অমরেশবাবু দেখেন ঘটনাটি যে রাত্রে ঘটে বলে অপর পক্ষ দাবী করছে সে রাতটা ছিলো অমাবস্যার রাত।আর ডাকাতরা উঠেই যদি হারিকেন লাঠির আঘাতে ভেঙ্গে ফেলে তাহলে অন্ধকারে ডাকাতদের চেনা সম্ভব নয়।ডাকাতদের মুখ ছিলো কালো কাপড়ে বাঁধা এবং তারা ইশারায় কথা বলছিলো। অপর পক্ষের কথা অনুযায়ী তারা ডাকাতদের চিনেছিল জোছনার আলোতে।
 অমাবস্যার রাতে জোছনার আলো! কেসটা অমরেশবাবু জিতেছিলেন।আর এইভাবে খোকনের সাথে তার পরিচয়।অনেক পরে তিনি জেনেছিলেন খোকন ছিল রামচন্দ্রপুর গ্রামের অসহায় মানুষগুলির দীনবন্ধু।গ্রামের যারা মাথা অর্থাৎ মোড়ল টাইপের মানুষেরা এই অসহায় মানুষগুলির প্রতি যে অন্যায় করতো,তাদের জমিতে কাজ করিয়ে পুরো টাকা দিতো না - এইসবের প্রতিবাদ করতো এই খোকন।কিছুতেই তারা খোকন এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে পেরে উঠছিলো না।তাই শেষমেষ খোকন সহ তার এই কাজে সহায়ককারিদের বিরুদ্ধে কেস দেওয়া।আর এখান থেকেই রায় চৌধুরী বাড়ির সাথে খোকনের যোগাযোগ এবং আস্তে আস্তে পরিবারের একজন হয়ে ওঠা।
 খোকন অমরেশবাবুকে বাবু এবং শান্তিদেবীকে মা বলে ডাকতো।ছেলেবেলায় বাবা,মাকে হারিয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে হয়ে ওঠে।এমনভাবে সে বাবু,মা বলে ডাকতো তাতে যারা তাকে চিনতো না তারা বুঝতেও পারতো না খোকন এ পরিবারের ছেলে নয়।অমরেশবাবু ধর্মের ভেদাভেদ কোনদিনও মানতেন না।তিনি মানুষের মনুষ্যত্ব দেখে তার বিচার করতেন।খোকনের নামাজের সময় হলে যেমন সে বাড়ির যে কোন জায়গায় নামাজ পড়তে পারতো আবার বাড়িতে পুজো পার্বণের দিনে খোকন উপোস থেকে অঞ্জলী দিতো।সে ফুল সে নিজেই মায়ের পায়ের উপর দূর থেকে ছুড়ে ফেলতো।
 খোকনের ছিলো সাপে প্রচণ্ড ভয়।রায় চৌধুরী বাড়িতে ঘটা করে মনসা পুজো হত।সেই পুজোতে পুরো গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন আসতো।ভীষণ জাগ্রত ছিল এই রায় চৌধুরী বাড়ির মনসা পূজো।গ্রামের বাড়ি-বাগান জঙ্গল চারিপাশে।খোকন যেদিন যেখানেই সাপ দেখতো সেদিনই দুধ আর কাঠালী কলা কিনে এনে মাকে বলতো তার নামে মনসা গাছতলায় পুজো দিয়ে দিতে।খোকন অমরেশবাবুর প্রতিটা মেয়েকেই নিজের দিদি/বোন হিসাবেই দেখতো।শুধু তাই নয় ছোটরা কোন ভুল করলে রীতিমত দাদার মত তাদের শাসন করতো।এতে কিন্তু বাড়ির মালিক কিংবা মালকিন কিছুই মনে করতেন না। তাঁদের সাথে খোকনের যেন এগুলি অলিখিত চুক্তি ছিলো।যেহেতু খোকনের এক দাদা ছাড়া তিনকুলে আর কেউ ছিলো না এবং দাদা ছিলেন বিবাহিত তাই আস্তে আস্তে খোকন সম্পুর্নভাবেই রায় চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা হয়ে ওঠে।তারজন্য আলাদা ঘর তৈরি হয়।সম্পত্তি,জমিজমা এতই ছিলো আর সেইসব জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান ও সবজি চাষ হওয়ার ফলে এরূপ কিছু মানুষের বাসস্থান এই বাড়িতেই হয়ে উঠেছিল।
 অমরেশবাবু ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ব্যক্তি আর শান্তিদেবীও ঠিক তাই।ঠিক যেন মানুষের উপকার করার জন্য এই দুটি মানুষ মুখিয়ে থাকতেন।ব্যাপারটা ছিল আগুনের সাথে ঘিয়ের যোগাযোগ।
 এভাবে মানুষের উপকার করতে করতে অমরেশবাবু ঠিক করলেন পঞ্চায়েত ইলেকশনে যদি তার স্ত্রীকে দাঁড় করানো যায় আর তিনি যদি জয়লাভ করেন তাহলে আরও অনেক মানুষের উপকারে আসতে পারবেন।শান্তিদেবী ইলেকশনে দাঁড়ালেন। তাঁর প্রতীক ছিলো মাছ।খোকন সহ গ্রামের মানুষ কিছু শ্লোগান তৈরি করলো।"মাছ যায় ভেসে ভেসে,ভোট দেবেন হেসে হেসে", "শান্তিলতাকে দিলে ভোট,শান্তি পাবে গ্রামের লোক"।বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেন শান্তিদেবী।
 পঞ্চায়েত ইলেকশনে জয়লাভ করার পর প্রথমেই শান্তিদেবী রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাহায্যে পাঁচশ শাড়ি গরীব মানুষদের ভিতর বিতরণ করলেন।সবই ব্যবস্থা করেছিলেন অমরেশবাবুই।তারপরের কাজটি ছিল গ্রামের একদম দরিদ্র মানুষদের জন্য পঞ্চায়েত অফিসের পাশেই অস্থায়ী ঘর তৈরি করে সেখানে রান্না করে পরিবারের সদস্যের মাথাপিছু খাবার দেওয়া দুবেলা।এইসব কাজ সম্পূর্ণভাবে খোকন দেখাশুনা করতো।এবং কাজ যাতে সুষ্ঠভাবে হয় অর্থাৎ আদতে দরিদ্র পরিবারগুলি যাতে কোনভাবেই বঞ্চিত না হয় তার সবকিছুই তদারকিতে ছিল খোকন।
  সব জায়গাতেই ভালোমন্দ সব রকম মানুষই বাস করে।এই কাজে নানানভাবে নানান দিক থেকে অর্থ সাহায্য আসতে থাকায় কিছু মানুষ সেই অর্থ নিজেদের কবলে নেওয়ার জন্য খোকনকে প্রস্তাব দিলো।খোকন তা অস্বীকার করে।শুরু হয় তাদের সাথে খোকনের শত্রুতা।নানানভাবে খোকনকে ভয় দেখাতে শুরু করে।কিন্তু খোকন অদ্ভুতভাবে সব কথা তার বাবু,মায়ের কাছে গোপন করে যায়।(পড়ে সে জানিয়েছিল বাবু,মাকে চিন্তায় ফেলতে চায়নি) এ সবকিছুর ফলস্বরূপ একদিন রাতে খোকন গ্রামের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে তখন কিছু লোক তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে পরনের লুঙ্গি খুলে পা দুটিকে শক্ত করে বেঁধে ফাঁকা মাঠের ভিতর টেনে নিয়ে গিয়ে আধমরা করে রেখে পালিয়ে যায়।হয়ত তারা ভেবেছিলো খোকন মারাই গেছে।সারাটা রাত মাঠের ভিতর পরে থাকে খোকন।সকালে কিছু মানুষ তাকে মাঠের ভিতর দেখতে পেয়ে অমরেশবাবুর বাড়িতে খবর দেয়।তড়িঘড়ি তাকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।বেশ কয়েকদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে থাকতে হয়।তারপর সুস্থ্য হয়ে বাড়িতে ফিরেই সে দ্বিগুণ কর্মক্ষমতায় কাজ শুরু করে।তখন সে যেন খোচা খাওয়া বাঘ।

 ক্রমশঃ

Wednesday, November 10, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (তেরো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (তেরো পর্ব)
  অমরেশবাবুর পঞ্চম কন্যাটি ছিলো বেশ ডাকাবুকো স্বভাবের।গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে সে কিন্তু শহরে আসেনি কলেজে পড়তে।হুট করে প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের এক পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করে দিলো।বয়স তখন তার সতেরো বছর।তখনকার দিনে তো একবারেই গিয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হত।তাই মাধ্যমিক পাশ করতে করতেই পনেরো,ষোলো বছর।এমতাবস্থায় প্রাইমারী স্কুলে টিচার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে ওই বয়সেই দরখাস্ত করে বসলো কাউকে কিছুই না জানিয়ে।
 চাকরির পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড যখন এলো তখন তার বয়স আঠারোতে পড়েছে সবে।আর অদ্ভুত ব্যাপার হল ইরা চাকরির এই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে গেলো।কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো তার পোষ্টিং নিয়ে।
  বাড়ি থেকে ঘোর আপত্তি এ চাকরি নিয়ে।এই বয়সে এতটা পথ হেঁটে যাতায়াত করতে গিয়ে শরীর তো ভাংবেই উপরন্তু রাস্তাঘাটে নানান বিপদ-আপদ ঘটতে পারে তাই বাড়ির কেউই চায় না রোজ বারো মাইল হেঁটে ইরা এ চাকরি করুক।বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছ'মাইল।যেতে আসতে তার বারো মাইল পথ হাঁটতে হবে।কারণ পুরোটাই হল মাটির রাস্তা।বর্ষাকালে জলকাদায় ভর্তি থাকে গ্রামের রাস্তাগুলি।মাঝে মধ্যে রিক্সা ভ্যান চলে ঠিকই কিন্তু তা যে সব সময় পাওয়া যায় তাতো নয়।আর প্রথম অবস্থায় মাইনেই বা কটা টাকা যে রোজ রিক্সা,ভ্যানে যাতায়াত করবে? মোদ্দা কথা এ চাকরিতে যোগদান করা যাবে না। আরও পড়াশুনা করে আরও ভালো চাকরির চেষ্টা করতে হবে।
 কিন্তু ইরা শুনবে না সে কথা।সে এই চাকরি করবেই।সে রোজ ওই বারো মাইল পথ হেঁটেই যাতায়াত করবে।কেউই তাকে বোঝাতে পারলো না এতে তার শারীরিক মারত্মক ক্ষতি হবে। ঝড়,বৃষ্টি,রাত-বিরেতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।সে গো ধরে বসে থাকলো এ চাকরি সে করবেই।চাকরিতে সে জয়েন করলো।নিত্য এ বারো কিলোমিটার (তখনকার দিনে কিলোমিটার বলা হত না মাইল ই বলা হত)পথ সে অনায়াসে হেঁটে যাতায়াত করতো।
  হঠাৎ করেই তার মনেহল সে প্রাইভেটে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।যেমন ভাবা ঠিক তেমনই কাজ।বইপত্র জোগাড় করে সে শুরু করলো অতোটা পথ হেঁটে যাতায়াত করার পর বাড়িতে এসে পড়াশুনা।কি অদ্ভুত তার শারীরিক এবং মানসিক দৃরতা।এইভাবে সে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে।কিন্তু নানানভাবে চেষ্টা করেও সে কিছুতেই বাড়ির কাছে বদলী হয়ে আসতে পারে না।যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি তার মানসিক দৃরতা যেমন বাড়িয়ে চলেছে ঠিক তেমনই সেই অদৃশ্য শক্তিই তার বদলীর পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।এইভাবে পাঁচ থেকে ছ'বছর চাকরি করার পর সে গ্রামের বাড়ির পাশের স্কুলে আসতে সক্ষম হয়।
 তবে এই যাতায়াতের মধ্যে সে বন্ধু,দাদা কিংবা গার্জিয়ান হিসাবে পাশে পেয়েছে তাদের খোকনদাকে।( যার পুরো নাম শেখ আহম্মদ আলী খোকন।পড়ে তার প্রসঙ্গে আসছি।একটি ভিন্ন ধর্মের ছেলে কিভাবে তার অমায়িক ব্যবহার আর ভালোবাসার গুনে একটা ব্রাহ্মণ বাড়ির ঘরের ছেলে হয়ে উঠেছিলো)যেকোন সময় যে কেউ যখন বিপদে পড়েছে খোকন কিন্তু সেখানে যমদূতের মত এসে হাজির হয়েছে।
 একবার ঈদের সময় খোকন বাড়ির সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো তার বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে যেতে হবে শুধু নয় রাতে তার বাড়িতে থাকতেও হবে।বাড়ি ফাঁকা রেখে সকলের পক্ষে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।অগত্যা ঠিক হল ইরা থাকবে বাড়িতে কারণ রাতে একা থাকতে তার কোন ভয় করবে না।আর ঈদের জন্য কোর্ট বন্ধ থাকায় সেদিন অমরেশবাবুও শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন।দিন থাকতে থাকতেই খোকন ইরা আর অমরেশবাবু বাদে অন্য  সবাইকে নিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো।বাড়িতে থেকে গেলেন বাপ আর বেটি।খোকনের দিয়ে যাওয়া ঈদের খাবার খেয়ে তারা সেদিন একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েন।রাত তখন প্রায় একটা হবে।কিছু শব্দে ইরার ঘুম ভেংগে যায়।সে বুঝতে পারে বাড়িতে চোর এসেছে।অন্ধকারের মধ্যে পা টিপে টিপে শব্দটা যেদিক থেকে আসছে সেখানে যায়। হ্যাঁ তার অনুমান সঠিক। চোরে সিদ কাটছে।আগেই বলেছি অমরেশবাবুর বাড়িটি ছিল কাঠের বেড়া দেওয়া আর মেঝে ছিল মাটির।কিন্তু উঠোন থেকে খুব উচুঁ ছিল তাদের ঘরগুলি।বারান্দা ছিল তিনদিকে।যেদিকে বারান্দা ছিলো না সেখানে ছিল ঠাকুর ঘর।
 আগেকার দিনে গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়িগুলোতে চুরি,ডাকাতি লেগেই থাকতো।তাই বাড়ির প্রোটেকশনের জন্য চারিপাশে বারান্দা থাকতো।ডাকাত আসলে আলাদা ব্যাপার কিন্তু চোর আসলে অন্তত সিদ কাটতে পারবে না।(হয়ত আজকের যুগে অনেকেই এই সিদ কথাটার অর্থ  বুঝতে পারবেন না।তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি এই সিদ হচ্ছে মাটির ঘরের যে মেঝে থাকে তা শাবল জাতীয় কিছু দিয়ে কেটে বড় গর্তের মত করা হয় যা দিয়ে সরাসরি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা যায়।এমনভাবে ওই ফাঁকাটা বা গর্ত করা হয় যার ভিতর দিয়ে একটি মানুষ অনায়াসে ঘরের ভিতরে ঢুকতে পারে)চোর গ্রামেরই লোক।সে জানতো এই বাড়ির কোথায় কিভাবে সিদ কেটে ঢুকতে হবে তাই সে ঠাকুরঘরের দিকেই সিদ কাটতে থাকে।ইরা তার বাবুকে গিয়ে সব জানালে তিনি তাকে বলেন,
--- চুপচাপ শুয়ে থাকো ওরা ঘরে ঢুকে যা নেবার নিয়ে যাক।
 কিন্তু ইরা তো অকুতোভয়।সে তার বাবুর এ কথা মানতে পারলো না।সে তার বাবুকে জানালো,
--- তুমি চুপচাপ এই ঘরে বসে থাকো।কোন অবস্থাতেই ঘর থেকে বেরোবে না।যা করার আমিই করছি।
 অমরেশবাবু অনেকবার তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন।কিন্তু এত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্র তো ইরা নয়।সে তার বাবুর অনুরোধ,আদেশ কোনটার তোয়াক্কা না করে মাছ মারার কোচটা নিয়ে (এই কোচ হচ্ছে অনেকটা বড় ত্রিশূলের মত।ত্রিশূলে তিনটে চ্যাপ্টা লোহা আর কোচে থাকে দশ থেকে বারোটা কিংবা তারও বেশি লম্বা ধারালো সরু লোহা।যা খালবিলে বড় বড় মাছ দেখলে এই কোচ সেই মাছের উপর ফেলে মারা হয়।) যেখানে চোরে সিদ কাটছে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আগেই সে একটি ধানের বস্তা একাই টেনে এনে ঠাকুরঘরে রাখে।একটা চল্লিশ কিলোর বস্তা টেনে আনা ইরার পক্ষে কোন ব্যাপারই ছিলনা।(এত পরিশ্রম আর ভারী জিনিস টানাটানির ফল অবশ্য সে বৃদ্ধা বয়সে এসে হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে)এই সব কাজই কিন্তু সে অন্ধকারের মধ্যে অতি সন্তর্পনে করেছে যাতে বিন্দুমাত্র শব্দ না হয়।আর তার বাবু অন্ধকার ঘরে খাটের উপর বসে ঠকঠক করে কাঁপতে থেকেছেন।চোর সিদ কেটে সবে মাত্র যেই তার মাথাটি ওই গর্তের ভিতর দিয়ে ঢুকানোর চেষ্টা করেছে অমনি ইরা তার হাতের কোচটি দিয়ে চোরের মাথায় আঘাত করেছে। চোরটি আর্তনাদ করে তার মাথাটি বের করে নেওয়ার সাথে সাথেই ইরা ধানের বস্তাটি  ওই গর্তের মুখের কাছে টেনে দিয়ে মুখটি বন্ধ করে দিয়েছে।

ক্রমশঃ 

Tuesday, November 9, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (বারো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে(বারো পর্ব)
  কোঠাবাড়ির স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।যুগযুগ ধরে ওইভাবেই ওই একই জায়গায় ইটের স্তূপ পড়ে রইলো।সাপ,ব্যাঙের উপদ্রপের ভয়ে বাড়ির কেউই আর ওদিকটা যেত না।
  একবার বাড়ির বছর মাইনের অপর একটি ছেলে নাম গোপাল নারকেল তেল ভাঙ্গানোর জন্য শুকনো নারকেল নিয়ে (নারকেল ছুলে নাকেলের টুকরোগুলোকে ছোটছোট করে কেটে রোদে শুকিয়ে মেশিনে দিয়ে তেল করা হত) ভাঙাতে গেলো।কিন্তু সে আর ফিরে এলো না চারিদিকে লোক পাঠানো হল।কিন্তু তাকে কেউ খুঁজে পেলো না।সকলেই বুঝতে পারলো গোপাল ফিরবে না বলেই ফেরেনি।সে ওগুলি চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়েই বেরিয়েছিল।কিন্তু দিন সাতেক পরে ঠিক সন্ধ্যার দিকে গোপালের বাবা তাকে সাথে নিয়ে রায় চৌধুরী বাড়িতে হাজির।
 একবার গোপালের বাবা রামকৃষ্ণ মজুমদার জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় মারত্মকভাবে ফেঁসে যান।অমরেশবাবু ছিলেন আসামী পক্ষের উকিল।জেল ছিল নিশ্চিত।কিন্তু অনেক চেষ্টায় তিনি রামকৃষ্ণকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন।আর তারপর থেকেই এই গরীব মানুষটা অমরেশবাবুকে দেবতা জ্ঞানে মান্য করতো।গোপাল সেদিন সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে মামার বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছিল।মামাবাড়ির লোকেরাও জানতো না যে সে এই কুকৃত্তী করেছে।যখন রায় চৌধুরী বাড়ি থেকে গোপালদের বাড়িতে তাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠানো হয়েছিলো তারা তখনই সবকিছু জানতে পেরেছিল।আর তারপরই তার খোঁজ মেলে তার মামাবাড়িতে।গোপালকে তার বাবা মেরে প্রায় আধমরা করে ভ্যানে বসিয়ে অমরেশবাবুর সামনে হাজির করে।অমরেশবাবু গোপালের ওই অবস্থা দেখে রামকৃষ্ণকে চরম ভর্ৎসনা করে সেই মুহূর্তে গ্রামের ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ্য করার চেষ্টায় ব্রতী হন।সেখানে উপস্থিত সকলেই অবাক!যে ছেলেটি তার বাড়ি থেকে জিনিস চুরি করে চম্পট দিয়েছিল তাকে হাতের কাছে পেয়ে তাকে শাস্তি দেওয়ার থেকে সুস্থ্য করে তোলার জন্য বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।এই হলেন অমরেশবাবু।
  গোপাল তার বাবার সাথে নিজেদের বাড়িতে চলে যায়।কারণ অমরেশবাবুর ইচ্ছা থাকলেও তার স্ত্রী এবং মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি তাকে রাখতে সাহস আর পান কি করে?
 অমরেশবাবু যখন থেকে রোজগার করতে শুরু করেছেন ঠিক তখন থেকেই তিনি তার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম,এবং নিজ গ্রামের অজস্র অসহায় গরীব মানুষদের সাহায্য করেছেন যা অনেক ক্ষেত্রেই তার নিজ পরিবারও জানতে পারেনি।শুধু কেউ বিপদে পড়লে বিনা টাকায় কেস লড়াই নয় পারিবারিক সাহায্যের হাতও বাড়িতে দিতেন।তার মৃত্যুর পর সেই সব ছেলেমেয়েদের বাবা,মায়েরা হয়ত কেউ দাঁড়িয়েছে তাই মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে বা অর্থ সাহায্যের প্রয়োজনে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন তখন তাদের মুখ থেকে বাড়ির সদস্যরা জানতে পেরেছেন।
 বাড়িতে প্রচুর সবজি,ফলমূলের চাষ হত।অনেক সময় গ্রামের গরীব মানুষগুলি চেয়ে নেওয়ার পরও চুরি করেছে।তাকে সেসব কথা জানালে তিনি বলতেন,
--- যা তাদের দেওয়া হয়েছে হয়ত তাতে তাদের প্রয়োজন মেটেনি।তাই আমাদের বাগান থেকে বা মাঠ থেকে কিছু জিনিষ তুলে নিয়েছে।তোমরা এটাকে চুরি বলছো কেন?ওরা তো গরীব মানুষ।আমাদের অনেক আছে।সামান্য পরিমাণ কেউ নিয়ে নিলে আমাদের তেমন কোন ক্ষতি হবে না।অথচ ওরা আনন্দিত মনে ওগুলি খেতে পারবে।তাই ওদের কিছু বোলো না।
 এহেন মানুষটা যদি একবার রেগে যেতেন তাহলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিতেন। নটি মেয়ে এবং সকলের শেষে একটি মাত্র ছেলে। ছ'নম্বর মেয়েটির নাম ছিল রণিতা।অমরেশবাবু কোন গালিগালাজ পছন্দ করতেন না কোনদিনও।একবার তার দুই মেয়ে মিলে চরম ঝামেলা করতে শুরু করে নিজেদের জামাকাপড় নিয়ে।হঠাৎ রণিতা তার দিদি ইরাকে বলে বসে,
--- শয়তান একটা 
 অমরেশবাবুর কানে যেতেই তিনি।চেম্বার ছেড়ে ঘরে ঢুকে রণিতাকে বলেন,
--- বাজে কথা বললি কেন? দিদির কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।
--- ও আমাকে আগে বলেছে।তারপর আমি বলেছি।
--- আমি ওকে বলতে শুনিনি।তোকে বলতে শুনেছি।ক্ষমা তোকে চাইতেই হবে।
--- ওতো আমার বড়।বেশি চালাক ।তোমার কানে যাতে না যায় সেই জন্যই ও আস্তে বলেছে।আমি তো ছোট।ওর মত অত বুদ্ধি আমার নেই।আমি বুঝতে পারিনি তোমার কানে গেলে তুমি চেম্বার ছেড়ে ঘরে আসবে।
 মেয়ের যুক্তি এবং বুদ্ধির কাছে হেরে গেলেও জোর করে তাকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে পারেননি।কারণ রিনিতার কথাকে সমর্থন জানিয়েছিল তার আর এক দিদি।রিনিতা তাই দেখে বলেছিলো,
--- তুমি তো উকিল মানুষ সাক্ষী ছাড়া কোনকিছু বিশ্বাস করোনা ওই তো আমার পক্ষে দাদা সাক্ষী দিলো।
 (একদিদিকে কেন তারা দাদা বলতো এবার সেটাই বলছি)
 পরপর অনেকগুলি মেয়ে হওয়ার ফলে ভাই বা দাদা না থাকাতে ভাইফোঁটার দিনে তাদের মন খুব খারাপ থাকতো।একবার রিনিতা ভাইফোঁটার দিনে খুব কান্নাকাটি করার সময় দিদি মালতী তাকে বলেছিলো,
--- ভাই নেই বলে এত কান্নাকাটির কি আছে আমি তো তোর বড় দিদি।আজ থেকে আমায় তুই দাদা ডাকবি।আর আগামীবার ভাইফোঁটার দিনে আমায় ফোঁটা দিবি।
 সেই থেকে ছোটরা সকলেই মালতীকে দাদা বলেই ডাকতো।তারপর যতদিন না তাদের ভাই হয়েছে তারা ভাইফোঁটার দিনে মালতীকেই ফোঁটা দিতো।এবং এই ব্যাপারটিকে অমরেশবাবু ভীষণভাবে সমর্থন করতেন।এই দিনে তিনি তার বোনের বাড়ি ফোঁটা আনতে গেলেও বাড়িতে ভাইফোঁটার আয়োজন করেই বেরোতেন।
 খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভীষণ নিখুদ মানুষ।বাজারের সেরা জিনিসটিই তিনি কিনে আনতেন।কিন্তু নিজের এবং বাড়ির অন্য সকলের পোশাকআশাক নিয়ে তার কোন হেলদোল ছিলো না।একমাত্র পুজোর সময় পরিচিত দর্জিকে বাড়িতেই তলব করতেন।গোটা একটা ছিট-কাপড়ের থান নিজেই পছন্দ করে কিনে নিয়ে আসতেন।মেয়েরা সব উঠোনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তো।দর্জি তার বিশাল লম্বা খাতায় সকলের জামার মাপ নিয়ে লিখে নিয়ে যেতেন। জামা তৈরি হয়ে গেলে দর্জি নিজেই এসে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেতেন।পুজোর সময় সকলে একই ধাঁচের একই কাপড়ের জামা পরে ঠাকুর দেখে বেড়াতো।মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা টোন করতেও ছাড়তো না।তারা অমরেশবাবুর মেয়েদের ওই একই কাপড়ের জামা পরিহিত দেখে হাসাহাসি করে বলতো,
--- রায় চৌধুরী বাড়ির ইউনিফর্ম।
 কিন্তু সত্যি কথা বলতে তাঁর মেয়েরা তাঁর পছন্দ করা ওই একই কাপড়ের জামা পড়তে বেশ গর্ববোধ করতো।আবার পুজো প্যান্ডেলে একজন আর একজনকে খুঁজে না পেলে গর্বের সাথে অন্যদের কাছে জানতে চাইত
--- আমার মত এই একই জামা পড়া কাউকে দেখেছেন?
 পোশাকআশাকের প্রতি তাঁর যেমন কোন আগ্রহ ছিলো না ঠিক তদ্রুপ তাঁর মেয়েদেরও কোন আগ্রহ ছিলো না।প্রতিটা বোনের মধ্যে আন্তরিকতা,ভালোবাসা ছিলো ভীষণভাবে এবং যা একই ভাবে আজও তা সমানভাবে বিধ্যমান।সাজগোজ তিনি একদমই পছন্দ করতেন না।বিশেষত তার অপছন্দের তালিকায় ছিল লিপস্টিক পরা। তাঁর সমস্ত মেয়েরা সব সময় তার পছন্দ অপছন্দের ভীষণভাবে মূল্য দিত।প্রতিটা মেয়ের কাছেই ছিলো তাদের বাবুর কথায় শেষ কথা।মেয়েরা তাদের বাবুর কথাকে বেদবাক্য এ সম্মান জানাতো।মাকে তারা ভয় পেলেও 
তাদের কাছে তাদের বাবুই ছিলেন বেস্ট ফ্রেন্ড।সকলের মনের কথা বলার একজন খুব কাছের বন্ধু।

ক্রমশঃ 

Thursday, November 4, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (এগারো পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে ( এগারো পর্ব)
   জীবন কারো থেমে থাকে না।জীবন এগিয়েই চলে।তাই জীবন নামক উপন্যাসের যবনিকা তার মৃত্যুতেই আসে।এই উপন্যাসে প্রতিটা চরিত্র অমরেশবাবুকে ঘিরে।অমরেশবাবু ছাড়া বাকি চরিত্রগুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গেলে আসল মানুষটার কথা বলা হয়ে উঠবে না।সায়নী মনোতোষের জীবনকাহিনী তাদের সন্তানদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে নানান ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে।এবার অমরেশবাবুর সেজোমেয়েটির কথা বলবো।
 মনোতোষ সায়নীর কাছে আসার পর থেকে চৌদ্দ বছর বেকার থাকার পর ভারতী চাকরি পায় সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এর মাধ্যমে।এর আগে এই চৌদ্দ বছর সে পাড়ার একটি স্কুলে মাত্র দেড়শ টাকা বেকার ভাতা পেয়ে দিদি,ভগ্নিপতির আশ্রয়ে থাকতো।এই চাকরি পাওয়ার পরেই সে বাবার সাহায্য নিয়ে সামান্য জমি কিনে একে একে সমস্ত ভাইবোনদের দায়িত্ব নিতে শুরু করে খোদ শহর কলকাতাতেই।তখন অমরেশবাবুর শারীরিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।ইতিমধ্যে অভয়ানন্দের সাথে মালতীর প্রেমের কথা বাড়ির সকলেই জেনে গেছে। অমরেশবাবুর কানে যখন এ খবর পৌঁছালো তিনি চুপচাপই থাকলেন।কারণ তিনি জানতেন এরূপ একটি খবর ঘরের আনাচেকানাচে সর্বত্র ঘোরাঘুরি করছে।
 অভয়ানন্দ তার বাবার কথামত উকালতি পাশ করলেও সেপথে না হেঁটে ব্যাংকে একটা চাকরি জুঠিয়ে নেয়।একইভাবে ওই চাকরির পরীক্ষায় মালতীও পাশ করে এবং সেও চাকরি পেয়ে যায়।অমরেশবাবু অভয়ানন্দকে এতটাই ভালোবাসতেন যে তিনি যখন বাজার করতেন মাছ,মাংসের হিসাবটা অভয়ানন্দকে ধরেই করতেন।তিনি তাকে প্রথম থেকেই সন্তান স্নেহের চোখেই দেখতেন।চাকরি পাওয়ার পরও দুবেলা মালতীদের বাড়িতে ছিল তার অবাধ যাতায়াত।
 মালতী, অভয়ানন্দের প্রতি তার ভালোবাসার কথা ভগ্নিপতি মনোতোষকে জানালে তিনি অর্থাৎ মনোতোষ কথা দেন বাবু এবং মাকে রাজি করানোর দায়িত্ব তার।এই সময় মনোতোষ কিন্তু কলকাতাবাসী এবং সামান্য জমি কিনে একটা ঘরও তুলেছে।
  অমরেশবাবু তার মেয়ের বিয়ের জন্য অতি সহজেই রাজি হয়ে গেলেন।কিন্তু যেহেতু বিয়ের দু তিন বছর আগে থাকতেই মালতী চাকরি করছে তাই বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে সামান্য যে লোক খাওয়ানো হয়েছিল সেই সব ব্যাপারে সমস্ত টাকাপয়সা মালতী নিজেই খরচ করেছিলো।এখানে উল্লেখ্য যে অমরেশবাবুর যে সব মেয়েরা তাদের বিয়ের আগে চাকরি পেয়েছে তিনি তাদের কাছ থেকে কোনদিনও কোন টাকাপয়সা নিতেন না।তারা তাদের ইচ্ছামত তাদের রোজগারের টাকা খরচ করতো।
 মালতীর বিয়ের দিন গ্রামের বাড়ি থেকে তার মা ভ্যান ভর্তি করে চাল, তরকারী আর পুকুরের মাছ ধরে পাঠিয়েছিলেন।আর বিয়ের আগেরদিন অমরেশবাবু অভয়ানন্দকে বাড়িতে ডেকে এনে নিজের বিয়ের আংটিটা হাত থেকে খুলে অভয়ানন্দের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, 
--- মেয়ের বিয়ের সমস্ত দায়িত্বই থাকে মেয়ের বাবা,মায়ের।কিন্তু আমি আমার মেয়েকে উপযুক্ত করে তৈরি করেছি।সে ভালো টাকা এখন রোজগার করে।আর হঠাৎ করে এই বিয়ে ঠিক হওয়াতে আমি সেভাবে কিছুই করে উঠতে পারলাম না।কিন্তু এই আংটিটা আমার খুব প্রিয় এবং এটা আমার বিয়ের আংটি।এটাই আমি তোমায় দিয়ে আশীর্বাদ করলাম।
 অভয়ানন্দ অমরেশবাবুকে ভীষণ ভালোবাসতো এবং শ্রদ্ধা করতো।সে আংটিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে।আংটির উপরে একটা 'A' লেখা দেখে বলে,
--- বাবু,এটাতে তো আপনার নাম লেখা।
--- হ্যাঁ বাবা।তোমার নামও তো A দিয়েই।তাই উপস্থিত মতে এটাই তোমায় দেওয়া শ্রেয় বলে মনে করলাম।আর আমি জানি আমার এই আংটির মর্যাদা একমাত্র তুমিই রাখতে পারবে।
--- কিন্তু বাবু আমি এ আংটি নিতে পারবো না।আমি আপনার এই পরিবারের এ আংটির যোগ্য নই।
--- আমি তোমাকে তোমার সেই ছেলেবেলার থেকেই খুব স্নেহ করি বাবা। হ্যাঁ এটাও ঠিক জামাই হিসাবে কোনদিন কল্পনা করিনি ঠিকই কিন্তু তোমার প্রতি আমার স্নেহ ভালোবাসাটা ছিল সম্পূর্ণ নিস্বার্থ।
 অভয়ানন্দ অমরেশবাবুর হাতটা টেনে নিয়ে আংটিটা পরাতে পরাতে বললো,
--- এই আংটিটা আমায় দিলে আমি যে সাময়িক আনন্দ পাবো তার থেকে এই আংটিটা আঙ্গুলে পরে সেই হাতটা আমার মাথায় রাখলে আমি সব থেকে বেশি আনন্দ পাবো।আর সেই আনন্দের জের আমি আজীবন একটু একটু করে মালাকে সাথে নিয়ে ভোগ করবো।
  না বিয়ের দিন তিনি কন্যা সম্প্রদান করতে যাননি।পারতপক্ষে এই যে তার ন'টি মেয়ে তিনি কোন মেয়েকেই সম্প্রদান করেননি।এই সম্প্রদান ব্যাপারটাই ছিল তাঁর কাছে অপছন্দের।সম্প্রদান কথাটার অর্থ শর্ত ত্যাগ করে কোনকিছু দান।যেটা তাঁর ছিলো ভীষণ অপছন্দের।সন্তানকে শর্ত ত্যাগ করে অন্যের হাতে সমর্পণ - এর ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি।তিনি সব সময় যুক্তি তর্ক দিয়ে অন্যদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন নিজ কন্যাকে শর্ত ত্যাগ করে দান করা যায় না।কারণ সন্তান তার বাবা,মায়ের শরীরেরই অংশ।শরীরের কোন অংশকে কেটে বাদ দিয়ে দিলে তা মৃত্যুরই সামিল হয়। কিন্তু সমাজ এবং বাঙ্গালী কালচারে বিষয়টি থাকার ফলে তিনি তার কন্যাদের বিয়ের সময়ে বিষয়টি থেকে বেরিয়ে আসতেও পারেননি।সম্প্রদান হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোন মেয়েকেই তিনি নিজে সম্প্রদান করেননি।
  অমরেশবাবুর বাড়িটি ছিল সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি।একবার তিনি মনস্থির করলেন ঢালাই দেওয়া বাড়ি করবেন।তখনকার দিনে যাকে কোঠাবাড়ি বলতো।ব্যাস যা ভাবা তাই কাজ।বাড়ির লাগোয়া বিশাল জমিতে শ্রমিক এনে ইট পোড়ানো শুরু হল।আর এই ইটের মাটি আসতে লাগলো রায় চৌধুরী বাড়ির ভিটে থেকে।সেখানে লোক লাগানো হল একটি পুকুর কাটার জন্য।এদিকে পুকুর কাটা হচ্ছে আর সেই মাটি এনে ইট তৈরি হচ্ছে।বাড়ির বড় বড় গাছপালা ঝোপজঙ্গল কেটে জ্বালানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।পঞ্চাশ থেকে ষাট জন শ্রমিকের নিত্য দুবেলা পেটপুরে খাওয়ার জন্য গ্রামের গরীব মানুষগুলির সাহায্যে রান্নার ব্যবস্থা থাকছে।এদিকে তার নির্দেশ অনুযায়ী দুপুরের রান্নাটা বেশি পরিমাণেই করা হত।তখন তাঁর বাবা যজ্ঞেশ্বর রায় চৌধুরী বেঁচে।ছেলের এ হেন মনোভাবে তিনি তো বেজায় খুশি।কারণ তিনিও মানুষটা যে এই রকমই।ইট তৈরি হয়ে ঢিপ হতে লাগলো।তখন সবেমাত্র তার বড় মেয়ে ও মেজো মেয়ের জন্ম হয়েছে।উঠোন বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে পুরো ঘিরে দেওয়া হয়েছে যাতে মেয়েরা ওইসব কাজের জায়গায় কোনভাবেই এগিয়ে যেতে না পারে।বাড়িতে রোজই চলছে উৎসবের আয়োজনের মত খাওয়াদাওয়া। ইটের ব্যবস্থা সারা হতেই রাজমিস্ত্রির খোঁজখবর শুরু হল।এই পুকুর কাটা,ইট তৈরি তা পোড়ানো এইসব কিছু করতে সময় লেগে গেলো প্রায় বছর খানেক।এদিকে সে বছর বৃষ্টি না হওয়ায় ফসলের ক্ষতি হল মারত্মক।এমন অনেক বাড়ি আছে গ্রামে যারা অন্যদের ধানিজমি সহ নানান ফসলের জমিতে কাজ করে জীবিকানির্বাহ করতো।বৃষ্টি না হওয়ার কারণে জমির ফসলের ক্ষতি হল প্রচণ্ড।তারা কাজ হারালো।খাদ্যের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলো।
 ফলে দেশে শুরু হল দুর্ভিক্ষ।যজ্ঞেশ্বরবাবু সারাটা দিনই এদিকওদিক ঘুরে বেড়াতেন।নানান জায়গা থেকে নানান খবর সংগ্রহ করে তিনি তার ছেলেকে ডেকে বললেন,
--- শোন ক্ষেতো আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ অসহায় এবং দরিদ্র শ্রেণীর।তারা পেট পুরে দুবেলা খেতে পারছে না।আর এ সময়ে আমরা যদি কোঠাবাড়ি তৈরি করি তাহলে আমাদের পরিবারের উপর মানুষের হাই লাগবে।এই মুহূর্তে আমাদের উচিত গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।তুই তোর এই চিন্তাধারা ত্যাগ কর।আমরা যেটুকু পারি বাপ,বেটা মিলে গ্রামের গরিবগুর্ম লোকগুলোর পাশে থাকি। কাল থেকেই আমরা শুরু করি অন্তত আমাদের গ্রামের মানুষগুলির মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে।তুই কালই রান্নার ঠাকুরের(রাধুনী)খোঁজ কর।দেখি কতদিন তাদের মুখে অন্তত একটু খিচুড়ি তুলে দিতে পারি।

ক্রমশঃ

Wednesday, November 3, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (দশম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (দশম পর্ব)
  সায়নীর বড় মেয়েটি শাওন তার বাবা,মায়ের প্রাণ।প্রতিটা বাবা,মায়ের জীবনে তাদের প্রথম সন্তান তাদের চোখের মনিই হয়।কিন্তু শাওন তার বাবা,মায়ের এই অন্ধ ভালোবাসাকে হাতিয়ার করে সমবয়সী ছেলেগুলির সাথে খোলামেলা জীবনযাপন করতে লাগলো। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সবকিছু জানার পরেও মেয়ের কথাই তারা বিশ্বাস করে অন্ধের মত চলতে থাকেন।ছেলেবন্ধুর সংখ্যা এতই যে তার আসল প্রেমিকটি কে এটা নিয়ে আত্মীয়দের তো বটেই প্রতিবেশীদের মধ্যেও কানাঘুষো চলতে থাকে।
  একদিন মনোতোষ অফিস থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের সাথে একটি হোটেলে একজন কলিগের জন্মদিন উপলক্ষ্যে খেতে যায়।যখন তারা বেরোবে মনতোষ দেখতে পায় তার শাওন একটি ছেলের সাথে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলো।অফিস কলিগরা সাথে থাকায় সে দেখেও না দেখার ভান করে বাড়িতে ফিরে এসে সায়নীকে সব জানায়।তখনো মেয়ে বাড়িতে ফিরে আসেনি। এ পর্যন্ত তার যতদিন দেরি হয়েছে তারা কিছু মনে করতো না কারণ শাওন বেরোনোর সময় বলতো কোচিংয়ে যাচ্ছে আর দেরি হলে বাড়িতে ফিরে জানাতো স্যার দেরি করে ছেড়েছেন।তারা তাদের মেয়েকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে কোনদিন তারা মনেই করেননি মেয়ে তাদের কাছে মিথ্যা বলছে বা সে তাদের মিথ্যা বলতে পারে।
 স্বামী,স্ত্রী উদ্বিগ্ন চিত্তে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।মনোতোষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।কারণ এর আগে সে বহুবার শুনেছে তার মেয়েকে রাতে বাইকে করে বড় রাস্তার মোড়ে একটি ছেলে এসে ছেড়ে দিয়ে যায়।এতদিন তারা বিশ্বাস না করলেও আজ নিজের চোখে দেখে সবকিছু তাদের কাছে জলের মত সব পরিস্কার হয়ে গেছে।
 মেয়ে বাইক থেকে নেমে তার বাবাকে দেখে ঘাবড়ে যায়।মনোতোষ ছেলেটির কাছে তার নামধাম,সে কি করে সব জেনে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরে।সারা রাস্তা বাপ,মেয়ের কোনোই কথা হয়না।
  অতি শান্তভাবে মেয়ের কাছ থেকে ছেলেটি সম্পর্কে সবকিছু জেনে নিয়ে তার খুব কাছের এক বন্ধু এবং তার স্ত্রীকে পাঠায় ছেলেটির সম্পর্কে তার বাড়িতে।খোঁজ খবর আনতে।কিন্তু তারা এসে অমিত সম্পর্কে যা জানায় তাতে মনোতোষ তার আদরের মেয়েকে সেখানে বিয়ে দেবে না পরিস্কার জানিয়ে দেয়।কিন্তু মেয়ে নাছোড়বান্দা।
 বাধ্য হয়ে মেনে নেয় তারা মেয়ের এই সিদ্ধান্তকে।কারণ এই ছাড়া মেয়ের জীবন রক্ষা করার আর কোন উপায় তাদের কাছে ছিলো না।অতি আদর আর যখন যা চেয়েছে তাই দেওয়ার ফলে শাওন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত অভিমানী প্রকৃতির।অন্য কোনকিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে এই চিন্তাধারা স্বামী,স্ত্রীর উভয়ের মনে ভীষণভাবে ঢুকে যায় শাওনের কান্না মিশ্রিত নানান কথায়।নিরুপায় বাবা,মা মেয়ের উপযুক্ত না জেনেও শুধুমাত্র তার জীবন রক্ষার তাগিদেই তারা অমিতকে মেনে নিয়েছে।অমিত তখনও বেকার।শাওন গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর অমিত মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ পদে একটি চাকরি জোগাড় করে নেয়।অতি দহরম-মহরম করে মেয়ের বিয়ে দিলেও আদতে তার শ্বশুরবাড়িটি ছিল ফস্কাগেরো।
 বিয়ের ছ'মাসের মধ্যেই শাওন সবকিছুই বুঝে ফেলে।কিন্তু তখন সে তো নিরুপায়।শ্বশুর সামান্য একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করেন।বাউন্ডুলে এক দেওর।সংসারের কাজ,খাওয়াদাওয়া সবকিছু নিয়েই শ্বাশুড়ির সাথে চলে মতবিরোধ।অমিত আর কটা টাকায় বা মাইনে পায়! শুরু হয় সায়নীর তার মেয়ের সংসারে নাক গলানো।মেয়ে অর্থ কষ্টে আছে,মেয়ের দিনরাত সংসারে কাজ করতে হচ্ছে এসব কিছুতেই মেনে নিতে পারে না সায়নী।কিন্তু মনতোষ তাকে বারবার নিষেধ করে মেয়ের সংসারে যাতে সে নাক না গলায়।
--- বারবার বলছি তোমায় শানু তুমি সানার সংসারে মাথা ঘামিও না।ওকে ওর মত করে মানিয়ে নিতে দাও।
--- সারাটা দিন মেয়েটাকে দিয়ে সংসারের কাজ করায়।মেয়েটা আমার এক মুহুর্ত সময় পায় না একটু বিশ্রাম নেওয়ার।
 কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে সায়নী।
--- কিছু করার নেই আমাদের।ওকে অনেক বুঝানো হয়েছিল ওই ছেলেকে বিয়ে না করতে।ও যেভাবে মানুষ হয়েছে তাতে ও যে ওই বাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে না সেটা তো আমরা ভালোভাবেই বুঝে গেছিলাম।কিন্তু ও কি শুনলো আমাদের কথা?আমাদের ভয় দেখালো অমিতের সাথে বিয়ে না দিলে ও সুইসাইড করবে।অনন্যোপায় হয়ে আমরা বিয়েতে মত দিই।কিন্তু একটা কথা মনে রেখো তুমি যদি ওকে ওই বাড়ি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করো সেটা কিন্তু একদম ঠিক হবে না।ওকে ওর মত করে সবকিছু মানিয়ে নিতে দাও।কিন্তু তুমি যদি তোমার মতামত ওর সংসারে দেওয়ার চেষ্টা করো তাহলে কিন্তু মারত্মক ভুল করবে।
--- কিন্তু অত বড় সংসার চালানো তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
--- কে তোমাকে ওদের সংসার দেখতে বলেছে?তারা তো কোন সাহায্য তোমার কাছে চায়নি?
--- আরে মেয়েটা একটু ভালোমন্দ খেতে পারে না,তাই তো আমি বাজার করে নিয়েl।
--- ভুল করছো।মারত্মক ভুল করছো।সানার সংসারটা ভেঙ্গে দিও না।অধিকাংশ মেয়ের মায়েরা মেয়েদের সংসারে নাক গলিয়ে সেই সংসার থেকে ভালো থাকা,ভালো খাওয়ার জন্য মেয়েকে বের করে নিয়ে আসে।মেয়েদের থেকে মেয়েদের মায়েরাই সংসার ভাঙ্গার জন্য দায়ী।মেয়ের বিয়ের পরে অনেককিছুই তার শ্বশুরবাড়ির পছন্দ হয়না মেয়েটির বাপের বাড়ির লোকের।এটাই স্বাভাবিক।দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পরিবার।আমাদের পরিবারের অনেককিছুই ওদেরও পছন্দ হয় না।কিন্তু মেয়ের ভালোর জন্য একটু চুপ করে থাকতে হয়।তারা তো তোমার মেয়ের প্রতি কোন অত্যাচার করছে না,না খাইয়ে রাখছে না।হয়ত তাকে একটু বেশি কাজ করতে হচ্ছে।তুমিও তো বিয়ের পর আমাদের বাড়িতে এসে সব কাজ করতে।আমি সব জানি।কিন্তু কিছু বলতাম না।কারণ বাবা,মাকে ছাড়তে চাইনি আমি কখনোই ।হয়ত রোজ মাংস ভাত সে পাচ্ছে না কিন্তু না খেয়ে সে থাকছে না।আমি তোমায় অনুরোধ করছি তুমি ওই বাড়ি থেকে ওকে বের করে আনার জন্য অমিতের সাথে কোন আলোচনা করনা।অমিত কিন্তু জীবনেও তোমায় ক্ষমা করবে না।ও কিন্তু সম্পূর্ন অন্য ধরণের ছেলে।আমি ওকে ঠিক চিনতে পেরেছি।
  মনোতোষের সব কথায় অরণ্যে রোদনে পর্যবসিত হয়।শুধু মেয়েকেই নয় সময়ে,অসময়ে তাদের কানে নানান কথা বলে সায়নী তাদের বাড়ি থেকে বের করে এনে ঘর ভাড়া করে রাখে।সায়নী ভেবেছিলো অমিত যা মাইনে পায় তাতে সে ঘরভাড়া দিয়ে খুব ভালোভাবেই সংসার চালিয়ে নিতে পারবে।আর মাঝে মধ্যে সে নানানভাবে ওদের সংসারটাকে দেখবে।একবারের জন্যেও বুঝতে পারেনি অমিতের মাইনে অতি সামান্য আর সে যেটা মুখে বলে সেটা সঠিক নয়।মনোতোষ তাকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিল কারণ একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের মাইনে কত হতে পারে তার মোটামুটি একটা ধারনা ছিল।কিন্তু সায়নী কষ্ট পাবে মনেকরে সঠিক সত্যটা সে সামনে আনতে পারেনি।
 সংসার যে একটা বড় রাজনীতির জায়গা। যত কাছের লোকই হোকনা কেন এমন অনেক ঘটনা,এমন অনেক কথা অতি প্রিয়জনের কাছ থেকেও মাঝে মধ্যে লুকিয়ে যেতে হয়।কারণ এমন অনেক সত্য আছে যে সত্য সব সময় সবাই নিতে পারে না। অন্যেকে দুঃখের হাত থেকে বাঁচাতে,কষ্ট না দিতে চাওয়ার কারণে অতি বড় প্রিয়জনকেও অনেক কথা লুকিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়।আর এরই নাম সংসার।সব থেকে বড় নাটকের মঞ্চ।

ক্রমশঃ 
  

Sunday, October 31, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (নবম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (নবম পর্ব)
  এক একটা মানুষের জীবনীএক একটা উপন্যাস বলা যেতেই পারে।সেই মানুষটাকে জড়িয়ে বাকি যারা রয়েছেন ঠিক তাদের জীবনী নিয়েও ছোট ছোট গল্পের সমন্বয়ে আরো বেশ কয়েকটি উপন্যাস তৈরি হতে পারে।আমার এই উপন্যাসটিও ঠিক তাই।পরিবারের মাথা অমরেশবাবু হলেও তাকে ঘিরে আর যারা রয়েছেন তাদের জীবনের সমস্ত ঘটনাগুলিও কিন্তু মস্ত বড় গল্প বা এক একটি উপন্যাস।
 সায়নীকে নিয়ে আমার উপন্যাস শুরু হলেও আস্তে আস্তে অনেক চরিত্রেরই অবতারণা হয়েছে।পরবর্তীকালে সায়নীর জীবনে কি ঘটেছিল শুধুমাত্র সেই ঘটনার কথায় জানাবো আপনাদের আজ।
 মনোতোষের সাথে সংসার করতে গিয়ে সায়নী বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারে আদতে মানুষটা খুবই ভালো।তার মন,মানসিকতা একটি সরল নিষ্পাপ শিশুর মত।কেউ চোখে জল নিয়ে কিছু তাকে বুঝালে সে সেটা সরল মনেই মেনে নেয়।তার নানান ফাঁদে পা দেওয়া এটাই মস্তবড় কারণ।
 এই দিপালী মেয়েটি সুন্দরী,শিক্ষিত।মনোতোষকে সে পছন্দ করে এবং তাকেই সে বিয়ে করতে চায়।কিন্তু মনোতোষ স্কুল জীবন থেকে সায়নীকে ভালোবেসে এসেছে।আর তাকেই বিয়ে করতে চেয়েছে।কিন্তু হঠাৎ করে দিপালী তার জীবনে এসে যাওয়ার পড়ে মনোতোষের অবস্থা দাঁড়ায় " শ্যাম রাখি না কুল রাখি গোছের "-।সে যখন দন্ডকারন্য থেকে বাড়িতে আসে তখন বাবা,মায়ের চাপে বিয়েতে মত দেয় কারণ তার আগেই সায়নীর বাবা "সীতার বনবাস হয়েছিল যেখানে সেখানে তিনি কোন অবস্থাতেই তার সানুর বিয়ে দেবেন না"- জানিয়ে দেন। এ কথায় তার বাবা,মা অপমানিত বোধ করেন এবং চোখ ভরা জল নিয়ে ছেলেকে সে কথা বুঝাতেও সক্ষম হন।তাই বিয়েতে মত দেওয়া।
 নানান কাঠ-খড় পুড়িয়ে যখন সায়নীর সাথে তার বিয়ে হয় সে কিন্তু তাকে সাথে করেই নিয়ে যেতে চেয়েছিল।কিন্তু এখানেও মনোতোষ পিছলে যায় তার বাবা,মায়ের চোখের জলে।সে বাধ্য হয় সানুকে রেখে যেতে।সানুর  কাছে কিন্তু কোন কথায় সে স্বীকার করে না যে তার বাবা,মায়ের মত নেই বলেই সে তাকে নিয়ে যেতে পারছে না।আর তখন তার মনের মধ্যে সব সময়ের জন্য একটা ভয় কাজ করতো তাহল এই যে কথায় কথায় সানুর বাবা যে কেসের ভয় দেখান যদি সেটা সত্যিই হয় তাহলে তার সরকারি চাকরি নিয়ে টানাটানি বেঁধে যাবে।কারণ তখন তার বয়সটাও খুব কমই ছিল তাই কি থেকে কি হবে ;সব সময়ের জন্যই মনের ভিতরে একটা ভয় কাজ করতো।এদিকে অমরেশবাবু যখন তার মেয়েকে হঠাৎ করেই পাঠিয়ে দিলেন তখন সত্যিই মনোতোষ কিন্তু কোয়ার্টারের জন্য চেষ্টা করছিল।কিন্তু দিপালী কিছুতেই সানুকে নিয়ে সংসার করাটা মেনে নিতে পারছিলো না।ওই যে আগেই বললাম মনোতোষকে যে কেউ যে কোন কথা বুঝিয়ে ফেলতে পারে কেঁদে-কেটে একসার হয়ে যদি তাকে সে বিষয়ে বোঝায়।তাই একটু হলেও কোয়ার্টার পাওয়ার ব্যাপারে মনোতোষের গড়িমসি ছিল।কিন্তু সায়নী যখন ঘর ভাড়া নিয়ে তার সাথে থাকতে চাইলো তখন সে মুখে কিছু না বললেও মনেমনে কিন্তু খুশিই হয়েছিল।
  মুখচোরা স্বভাবের মানুষগুলিকে নিয়ে যারা সংসার করে একমাত্র তারাই বলতে পারে এদের নিয়ে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে চলতে গেলে নিজেকেই সব জায়গায় ভিলেন সাজতে হয়।আর এর কারণ হচ্ছে এই মুখচোরা লোকগুলো অন্যের হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর না তে না করার ফলে ঘরের অন্য মানুষটাকেই সেই কথাগুলি সঠিক জায়গায় আনতে গেলেই চরিত্রের নাম হয়ে পড়ে ভিলেন।তাই অধিকাংশ জায়গাতেই সায়নী খুব বাজে মানুষ হলেও মনোতোষ কিন্তু ভীষণ ভালো মানুষ।এটা যে মনোতোষের কোন দোষ তা কিন্তু নয়।আর পরবর্তীকালে সায়নীরও ব্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গেছিলো।
  প্রথম সন্তান তাদের মেয়ে।তার যখন বছর খানেক বয়স তখন দীপালীর বিয়ে ঠিক হয়।দিপালী অফিসে এসে মনোতোষের কাছে সোনার কানের ঝুমকো দুল দাবি করে।মনোতোষ বাড়িতে গিয়ে সায়নীকে সে কথাও গল্প করে।সায়নী তখন তাকে বলে,
--- ভালো তো ।তুমি একবারে একই রকমের দুটো ঝুমকো দুলের অর্ডার করো।আমার ইচ্ছা আমিও ওর মত দুল পরবো।আর ওটা পরেই আমি ওর বিয়েতে যাবো।
 এই ব্যাপারটা মনোতোষ কিন্তু বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারে।মনোতোষের সৎ সাহস ছিল ঠিকই কিন্তু কথার ঘোরপ্যাচ সে বুঝতো না।তাকে কিছু বলতে গেলে সোজা সাপ্টা না বললে সে কখনোই বুঝতে পারতো না।কিন্তু সায়নীর সাথে সংসার করতে করতে সায়নী তাকে নিজের হাতে অনেকটাই নিজের মনের মত করে গড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।বুদ্ধিমান মনোতোষ তার চরিত্রের দোষ ত্রুটিগুলো নিজেই সংশোধন করে নিতে পেরেছে।পরবর্তীকালে সে এই রায় চৌধুরী পরিবারে অনেকগুলি জামাইয়ের মধ্যে ছিল অন্যতম জামাই।অমরেশবাবুর প্রিয় জামাই ছিলেন এই মনা।
 মেয়ের বয়স যখন বছর তিনেক তখন তাদের আর একটি ছেলে হয়। তারও প্রায় বছর চারেক পরে আর একটি মেয়ে।কিন্তু ছেলে যখন পেটে তখন ভারতী আসে তার দিদির কাছে।সে তার চাকরীটা ছেড়ে দিয়েই আসে ভালো কোন চাকরির আশায়।সে যে এখানে থাকতে এসেছিল সেও কিন্তু মনোতোষের কথায়।তখন অমরেশবাবুর বয়স হয়েছে বেশ অনেকটাই।মেয়েরা সবই বড় হয়ে উঠেছে।শুধুমাত্র আজকের দিনেই যে মেয়েদের পথেঘাটে নানানভাবে হেনস্থা হতে হয় তা কিন্তু নয় আগেও এ জিনিস ছিল,এখনো আছে শুধুমাত্র কম আর বেশি।
 ভারতী চাকরি করতো একটি প্রাইমারি স্কুলে।মর্নিং স্কুল ছিলো।খুব ভোরে ট্রেন ধরে তাকে স্কুলে যেতে হত।সেও একদিন ইভটিজিংয়ের সম্মুখীন হয়।আর তখনই তার বাবু তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে পরামর্শ দেন।সেই সময় মনোতোষ বাড়িতে ছিল এবং তার পরামর্শ মতই সে তার দিদির বাড়িতে গিয়ে ওঠে।
 সায়নীর বড় মেয়েটি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর নিজে পছন্দ করে বিয়ে করে।তবে সায়নী এবং মনোতোষ বেশ জাকজমক করেই তাদের বিয়ে দেয়।তবে ছেলেটি তার জীবনে সেভাবে কিছুই কোনদিন করে উঠতে পারেনি।কিন্তু প্রেমটা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলো।তাই মেয়ের বাড়ির চাপে বিয়ে করতেও বাধ্য হয়েছিল।যেহেতু মনোতোষ ভালো চাকরি করতো আর বেশ বড়োলোকের ছেলের সাথে ছোট মেয়েটির বিয়ে হয়েছিলো আর  এক এক্সিডেন্ট এ ছোট মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সকলেই মারা গেছিল শুধুমাত্র তাদের মেয়েটি ও নাতিটি ছাড়া।তাই এই বিপুল অর্থ ওই বেকার বাউন্ডুলে ভায়ের পিছনেও কম খরচ হয় না।
  সায়নী এবং মনোতোষের জীবনে সবচেয়ে দূর্ভাগ্য যেটা তা হল তাদের জীবনদশায় তাদের দু,দুটি মেয়ের বৈধব্য মেনে নেওয়া।জীবন সুখের বলা যেতে পারে তখনই যখন সন্তান প্রতিপালন করার পর বেঁচে থাকতে তাদের সুখী দেখা।বাবা,মায়ের সামনে নিজের সন্তান অসুখী বা দুঃখকষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকলে তাদের সেই দুঃখকষ্ট শত গুণ হয়ে নিজেদের বুকে আঘাত হানে।আর এইখানেই তাদের জীবনের চরম ব্যর্থতা নেমে আসে।সায়নী ও মনোতোষ ততদিনই সুখী জীবন কাটিয়েছেন যতদিন না তাদের ছেলেমেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।ছেলেমেয়ে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছে আর তাদের জীবনের চাহিদা,ভালোমন্দ নিয়ে সায়নী ও মনোতোষ তাদের অতিকষ্টে খুঁজে পাওয়া সুখ একটু একটু করে হারাতে শুরু করেছে।

ক্রমশঃ 
    

Saturday, October 30, 2021

জন্ম দিলেই মা হয় না

জন্ম দিলেই মা হয়না
  "ভগবান সব দিক থেকেই আমাকে মারলেন।গরীব বাপের ঘরে জন্মগ্রহণ করে প্রেম করে বিয়ে করলাম এক রিক্সাওয়ালাকে।ভেবেছিলাম রিক্সা চালিয়ে ও যা পাবে আর নিজে দু,এক বাড়ি কাজ করে ঠিক চলে যাবে।একটাই বাচ্চা নেবো তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করবো।ঠিকই চলে যাচ্ছিলো। সোয়ামী আমার খুবই ভালো।আমায় খুব ভালোবাসে।আমাকে কোন বাড়িতে কাজে যেতে দেয় না।কিন্তু আজ তিনবছর বিয়ে হয়েছে একটা বাচ্চা-কাচ্চা না হলে ভালো লাগে?তাই আজ ওকে নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছি ডাক্তার দেখাতে।"
  আজ বিদ্যাসাগর হাসপাতালে ভিষন ভির।সেই সকাল থেকে টিকিট কেটে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে না পেরে চঞ্চলা সিড়ির উপর এসে বসে।ওর মত আরো একজন রোগী প্রায় ওরই সমবয়সী ওর পাশে এসে বসে।সে তার মাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছে।তার সাথেই কথা প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলো চঞ্চলা।
 চঞ্চলার বাবা ভ্যানগাড়ি চালান।এক ছেলে,এক মেয়ে তার।চঞ্চলার মা সারাটাদিন লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করে বেড়ায়।বাবাটা যদি নেশা করে এদিক ওদিকে পরে না থাকতো তাহলে তাদের সংসারটা দুজনের রোজগারে ভালোই চলে যেত।কিন্তু নরেশ যা রোজগার করে তাই দিয়েই নেশা করে।চঞ্চলা সেভেন পর্যন্ত পড়েছে।কিন্তু পরিমলের সাথে প্রেম করে বিয়ের ভুত মাথায় চাপলো।তখনো তার আঠারো বছর বয়স হয়নি।পালিয়ে এলো।পরিমলের সাথে।বলেকয়ে আসলেও যে খুব একটা বাঁধা পেতো তা চঞ্চলার মনে হয়না।তবুও সে না বলেই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে।
 পরিমলের একমাত্র বিধবা পিসি।বাপ,মা কেউই নেই তার।পিসিও খুব ভালোভাবেই চঞ্চলাকে মেনে নিয়েছে।টাকা,পয়সা কম থাকলেও যে সুখী থাকা যায় তা চঞ্চলা আর পরিমলকে দেখেই বোঝা যায়।
 কিন্তু বিয়ের তিন বছরের মাথাতেও যখন চঞ্চলা মা হতে পারলো না তখন তার মন খুঁতখুঁত করতে লাগলো।সে পরিমলকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালো ডাক্তার দেখানোর জন্য।কিন্তু ডাক্তার দেখিয়ে চঞ্চলা আর পরিমলের মনই খারাপ হয়ে গেলো।কি একটা বড় অপারেশন করতে হবে।অপারেশন করলেই যে বাচ্চা আসবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।তবুও চঞ্চলা চায় সে অপারেশনটা করবেই।তবুও তো মনে একটা আশা থাকবে।
 অপারেশন করতে কোন টাকা-পয়সা লাগবে না ঠিকই।কারণ ও তো সরকারি হাসপাতালে দেখাচ্ছে।কিন্তু তারপরে তো অনেক ওষুধপত্র খাওয়াদাওয়া আছে।তারজন্য তো টাকা দরকার।পিসি দুই বাড়ি রান্না করে যা পায় এই সংসারের পিছনেই খরচ করে।পরিমল এখন রোজ ভোর ছটায় বেরিয়ে যায় আর অনেক রাতে বাড়ি ফেরে।একটা মাটির ভার কিনে এনেছে।রোজের রোজগারের টাকাটা রাতে বাড়িতে ফিরে ওই ভারের মধ্যেই রাখে।
  একদিন রাত প্রায় একটা হতে চললো।পরিমলের দেখা নেই।পিসি আর চঞ্চলা মিলে বড় রাস্তায় চলে এসেছে।রাস্তায় কোন জনমানব নেই।মাঝে মধ্যে কিছু কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে উঠছে।হঠাৎ দেখে পরিমল তার রিক্সাটাকে একহাতে টানতে টানতে আসছে।আর একটা হাত দিয়ে বুকের কাছে কিছু চেপে ধরে আছে।দুজনেই এগিয়ে গেলো তার দিকে।
--- ওমা এত একটা বাচ্চা গো।এখনো নাড়িটাও কাটা হয়নি।কি পাষণ্ড ওর জন্মদাত্রী গো!
 পিসি কথাগুলো বলে চলেছে আর চঞ্চলা এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে পরিমলের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছে।
--- ও পিসি তুমি ওর নাড়িটা কাটতে পারবে গো ?
--- আরে পারবো না কেন একটা নূতন ব্লেড ওই একটু জলে ফুটিয়ে নিয়ে কেটে দেবো।কিন্তু তুই এটাকে পালবি নাকি?আর পুলু তুই ওকে কোথায় পেলি?
--- আর বোলো না গো পিসি।ওই যে কালিতলার কাছে যে ডাস্টবিনটা আছে ওর ভিতর কে যেন ফেলে রেখে গেছে।ওর চিৎকার শুনেই তো আমি এগিয়ে গেলাম ডাস্টবিনের কাছে।
--- দেখো না গো পিসি কি সুন্দর দেখতে গো।কেউ চেয়ে পায় না আর কেউ পেয়েও হেলায় হারায়।
 চঞ্চলা পিসির উদ্দেশ্যে বললো কথাগুলো।
--- ওরে পুলিশের ঝামেলা হবে গো!
--- আরে কিচ্ছু হবে না।ওসব বড় লোকদের বেলায় হয়।আমরা হলাম গিয়ে গরীব মানুষ।বলবো আমার ছেলে।বাড়িতেই জন্মেছে।
--- আর পাড়ার লোক ?
--- ওইসব আমি ঠিক ভেবে নিয়েছি। কাল রাতের বেলা আমি মায়ের কাছে চলে যাবো।তোমাদের বলা হয়নি মাঝে একদিন মায়ের সাথে দেখা হয়েছিলো।মা আমায় বাড়ি যেতে বলেছে।মাকে সব গিয়ে বুঝিয়ে বলবো।সব ঠিক আমি ম্যানেজ করে নেবো গো পিসি।
  রাতে ঘরে চা করার যে দুধ ছিলো তাই বাচ্চাটাকে ওরা খাওয়ালো।পরিমল বললো," খুব ভোরে উঠে ভারটা ভেঙ্গে ওর জন্য কৌটোর দুধ নিয়ে আসবো আমি।হ্যারে চঞ্চলা, তুই বললি না তো আমার এই উপহারটা তোর কেমন লাগলো?
বাচ্চাটাকে বুকের সাথে চেপে ধরে চঞ্চলা বললো,
--- এতদিনে তুমি আমাকে এমন একটা উপহার দিলে যার কোনকিছুর সাথেই তুলনা চলে না গো।আমি ভীষণ খুশি। পেটে ধরিনি তাতে কি হয়েছে।ওকে মানুষ করে আমি দেখিয়ে দেবো জন্ম না দিলেও মা হওয়া যায়।


Friday, October 29, 2021

শুকনো গোলাপ

শুকনো গোলাপ
  সহপাঠী অমিতের প্রেমে পড়ে অতসী কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের একদম শেষের দিকে পড়াকালিন।কিন্তু মুখচোরা অমিতের কাছে সে কথা জানানোর কোন সুযোগই পায় না সে।অতসীকে দেখলেই অমিত এমনভাবে সেই স্থান ত্যাগ করে যেন বাঘের মুখে পড়েছে।মাঝে মাঝে অতসীর খুব রাগ হয়।আর মনেমনে ভাবে কলেজে এত ছেলে থাকতে এই হাবলুটার প্রেমে কেন যে পড়লাম সেটাই বুঝতে পারিনা পরক্ষণে ভাবে কবিগুরুর গানের সেই লাইন," প্রেমেরই ফাঁদ পাতা ভুবনে,কে কোথায় ধরা পড়ে কে জানে -"।
 অতসী অনেকবার খেয়াল করেছে যদি কখনো সখনো অমিতের সাথে তার দেখা হয় সে সরাসরি চোখের দিকে কখনোই তাকায় না।অনেক সময় অমিত হয়তো দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে অতসীকে দূর থেকে দেখছে।অতসী বুঝতে পারে অমিতও তাকে পছন্দ করে।কিন্তু মুখচোরা হাবলু কখনোই সাহস করে তাকে ভালোবাসার কথাটা বলতে পারেনি।অতসী সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু কোন না কোন ছুতোয় অমিত সেই স্থান ত্যাগ করেছে।কি করবে অতসী কিছুই আর ভাবতে পারে না।ভাগ্যের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ওই হাবলুর কথাই ভাবে।
 অতসীর আর্টস আর অমিতের সাইন্স।শুধু বাংলা আর ইংলিশ ক্লাসটা একসাথেই হত ওদের।অতসী খেয়াল করে দেখেছে সে ক্লাসে ঢুকে যে কোন বেঞ্চেই বসুকনা কেন ওই হাবলুটা তার পিছনের বেঞ্চের দিকে বসবে।মাঝে মাঝে অতসীর মাথা গরম হয়ে যেত।
  ফাইনাল পরীক্ষা চলছে।পরীক্ষার পর কে কোথায় ছিটকে যাবে তার কোন ঠিক নেই।অতসী মেনেই নিয়েছে তার জীবনের প্রথম প্রেম অঙ্কুরেই ঝরে গেল।খুব কাছের বন্ধুদেরও কথাটা সে জানাতে পারেনি।পরীক্ষার মধ্যেই একদিন অতসী খুব তাড়াতাড়ি কলেজ গেলো।মনেমনে ভাবলো,'যা কপালে আছে হবে।যেভাবেই হোক আজকে অমিতকে তার মনের কথা বলতেই হবে।আর মাত্র দুদিন সময় হাতে আছে। কালই অতসীর পরীক্ষা শেষ।গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে।যেই কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকছে কেউ একটু আড়চোখে তাকে দেখছে আবার কেউ বা দুকদম তার কাছে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইছে, "তুই কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছিস"।উত্তর একটাই "কাজ আছে।" একদম ঘণ্টা পড়ার কিছুক্ষণ আগে অমিত আসলো।বাস থেকে নেমেই এদিক ওদিকে না তাকিয়ে ঘড়ির দিকে একবার সময়টা দেখে নিয়েই দে ছুট।মুহূর্তের মাঝে ঘটনাটা ঘটে গেলো যে অতসী তাকে ডাকার সময়ই পেলো না।তবুও মরিয়া অতসী অমিতের পিছনে কিছুটা ছুটে গিয়ে বললো,"প্লিজ অমিত আমার কথাটা শুনে যাও।" 
 অমিত দাঁড়িয়ে পড়লো।অতসীর দিকে একবার তাকিয়েই মুখটা নামিয়ে নিয়ে বললো,"এক্ষুণি ঘণ্টা পরে যাবে। কাল আমাদের পরীক্ষা শেষ।আমরা কালকে কথা বলবো।আমারও কিছু বলার আছে তোমাকে।"
 অমিত কথাগুলো বলেই চলে গেলো।অতসী যেন আজ হাফ ছেড়ে বাঁচলো।এখন শুধু অপেক্ষা কাল পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত।
 অতসী পরীক্ষা শেষে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।অমিত কোথায় আছে বোঝার চেষ্টা করছে।হঠাৎ অমিতের এক বন্ধু এসে বললো,"অমিত তোর জন্য কলেজের বকুলফুল গাছটার কাছে অপেক্ষা করছে।তোকে ওখানে যেতে বলেছে।অমিতের বন্ধুর মুখ থেকে এ কথাটা জানতে পেরে অতসীর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো বকুল গাছটার দিকে।অমিত সেখানে বসে আছে।অতসীকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।এগিয়ে গিয়ে বললো," আমি জানি তুমি আমায় কি বলবে আর হয়তো তুমিও জানো আমি তোমায় কি বলবো।কিন্তু সবার আগে আমি তোমায় একটা উপহার দিতে চাই।হয়তো এই উপহারটাই তোমার এবং আমার না বলা সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
 অতসী হাত পেতে বললো,
--- দাও তবে।
  অমিত তার ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করে তার ভিতর থেকে একটা শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ বের করে অতসীর হাতে দেয়।আর বলে,
--- তিন বছর ধরে গোলাপটা আমার ব্যাগেই থাকে।কলেজে প্রথম যেদিন তোমায় দেখেছিলাম সেদিনই ভালো লেগেছিলো।কিন্তু দুজনের পড়াশুনার কথা চিন্তা করে সব কথা বলা হয়ে ওঠেনি।আর কিছুটা লজ্জাও ছিল।আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম শেষ পরীক্ষার দিন তোমায় উপহারটা দেবো।পছন্দ হয়েছে তোমার উপহারটা?
--- এই উপহারটার জন্য আমি দুবছর ধরে অপেক্ষা করছি।
--- আর আমি তিন বছর ধরে প্রতি মুহূর্তে সঠিক সময়ে তোমায় উপহারটা দেবো বলে বহন করে চলেছি।আজ আমি উপহারটা দিতে পেরে ভার মুক্ত হলাম।



 

Thursday, October 28, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (অষ্টম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (অষ্টম পর্ব)
   সংসারের নানান ঘাত_প্রতিঘাত ঘরে বাইরের নানান সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও মানুষটি অর্থাৎ অমরেশবাবু সর্বদায় থাকতেন ধীর,স্থির।কেউ কোনদিন রেগে গিয়ে তাকে কোন কটু কথা বলতে দেখেনি। একমাত্র তার মনটা খারাপ থাকতো তিনি যেদিন কোন কেসে হেরে যেতেন।দুবেলা আহ্নিক অর্থাৎ সন্ধ্যা করা,একবেলা ভাত খাওয়া বা অন্ন গ্রহণ করা নিষ্ঠাবান একজন ব্রাহ্মণ।তিনি খড়ম পরে সিমেন্টের উপর থেকে হাঁটাচলা করলেও কোন শব্দ হত না।পাড়ার অনেকেই তাকে শিবঠাকুর বলতেন। আরও বলতেন "এই মানুষটা মাটির উপর দিয়ে এমনভাবে হাঁটেন যাতে মাটিও ব্যথা না পায়।"
  অমরেশবাবুর একমাত্র বোন বীণাপাণি।বেশ অবস্থাপন্ন ঘরে মা বেঁচে থাকতেই বিয়ে দিয়েছিলেন প্রহ্লাদ মুখার্জীর সাথে।খুব সুখী হয়েছিলেন তবে সে সুখ স্থায়ী হয়েছিলো মাত্র তিন বছর।দুবছরের মাথায় বীণাপাণিদেবীর একটি পুত্রসন্তান হয়।কিন্তু আঠারো দিনের মাথায় পুত্রটি আতুর ঘরেই মারা যায়।তারপর তার আর কোন সন্তান হয়না।এইভাবে বিয়ের পর সাত বছর কেটে যায়।একই ঘর একই বিছানা হলেও স্বামীর সাথে সম্পর্ক নেই বললেই হয়।অনেকবার অমরেশবাবু তার বোনকে বলেছিলেন,"শ্বশুরবাড়ির পাঠ চুকিয়ে তুই আমাদের কাছে চলে আয়।" কিন্তু তার বোন রাজি হননি।তিনি তার শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে কোনদিনও এসে তার ভায়ের গলগ্রহ হতে চাননি।বিয়ের সাত বছরের মাথায় প্রহ্লাদবাবু পুনরায় বিয়ের তোড়জোড় করতে শুরু করেন।বিশাল সম্পত্তি দেখভালের জন্য তার উত্তরাধিকার চায়।বীণাপাণিদেবীর শ্বশুর,শ্বাশুড়ী তাদের একমাত্র ছেলের বউকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।তারা এ বিয়ের বিরোধীতা করেন।ঝামেলা মারত্মক আকার নেয়। প্রহ্লাদবাবু দুরাত বাড়ি ফেরেন না।শ্বশুর,শ্বাশুড়ির উদ্বিগ্নতা দেখে বীণাপাণিদেবী তাদের হাতে পায়ে ধরে রাজি করান এই মর্মে তাদের ছেলে বিয়ে করলে তার কোন আপত্তি নেই।তিনি সতীন নিয়েই ঘর করতে রাজি আছেন।
 চারিদিকে লোক পাঠিয়ে ছেলেকে খুঁজে আনা হল।অনিচ্ছা সত্বেও তারা তাদের ছেলের পুনরায় বিয়েতে মত দিলেন।কিন্তু পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলেন, "বৌমা ওই ঘরেই থাকবে সে যেন একটি নূতন ঘর তৈরি করে নেয়।"এ কথায় বাঁধ সাধলেন স্বয়ং বীণাপাণিদেবী নিজেই।তিনি তার শ্বশুরকে জানালেন,"বড় হওয়ার পর থেকেই তিনি অর্থাৎ তার স্বামী ওই ঘরেই থেকে অভ্যস্ত।তিনি কেন ঘর ছাড়বেন? আমিই ওই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবো।আপনি বরং আমার জন্য একটি ঘর তৈরি করে দিন।যে মেয়ে তার স্বামীকে ধরে রাখতে পারেনি,তাকে পিতৃত্বের স্বাদ দিতে পারেনি সে ঘর আটকে রেখে জীবনে কোন সুখ খুঁজে পাবে?"
  বিয়ের আগেই ঘর তৈরি হল।পুনরায় অমরেশবাবু তার বোনকে আনতে গেলেন।কিন্তু এবারেও তাকে খালি হাতেই ফিরে আসতে হল।শ্বশুরবাড়ির ভিটে ছেড়ে বিয়েদারি হয়ে তিনি কোন অবস্থাতেই বাপের ভিটেই ভায়ের সংসারে আসবেন না।
  মন্দিরে সিঁদুর পরিয়ে বাপ মা মরা নমিতাকে বউ করে প্রহ্লাদ মুখার্জী বাড়ি নিয়ে এলেন।কিন্তু বউ নিয়ে বাড়ি এসে দেখেন পুরো বাড়ি অন্ধকার।বেশ কয়েকবার "মা,মা" বলে চিৎকার করে ডেকেও কোন সাড়া পেলেন না।হঠাৎ দেখেন বীণাপাণিদেবী একহাতে হারিকেন আর এক হাতে বরণডালা নিয়ে বাড়ির সদর দরজার কাছে হাজির হলেন।একাই উলু দিতে নূতন বউকে বরণ করলেন।জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর হাসিমুখে নিজের হাতের সোনার নোয়া বাঁধানোটা খুলে নূতন বউকে বরণ করে ঘরে নিয়ে এলেন।সেই ঘরে যে ঘরে তিনি নূতন বউ হয়ে ঢুকেছিলেন।নূতন বউকে নিজের ঘরে নিজের বাবার দেওয়া খাটে বসিয়ে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নিজের বালিশ আর একটা টিনের বড় বাক্স নিয়ে।আগেই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি তিনি ওই টিনের বাক্সে ভরে রেখেছিলেন।আজীবন তিনি আর ওই ঘরে ঢোকেননি।
  প্রহ্লাদবাবুর বাবা,মা পরদিন থেকে ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করলেন।শ্বাশুড়ী দুই বউয়ের মাঝে কাজ ভাগ করে দিলেন।নমিতাদেবির ভাগে পড়লো রান্নাবান্না,বাড়ির সবাইকে খেতে দেওয়া।আর বাকি সবকিছুর তদারকি,শ্বশুর শ্বাশুড়ির দেখভাল আত্মীয়-স্বজনের সাথে লোক লৌকিকতা সবকিছুর ভার বড় বউয়ের।ঝামেলা ছাড়াই সংসারে দুই বউ নিজেদের মত করেই দিনাতিপাত করছিলো।বড় বউয়ের গুনে ছোট বউ তার সতীনকে নিজের দিদির আসনেই বসিয়েছিল।কিন্তু বীণাপাণিদেবী আমৃত্যু একই বাড়িতে থেকেও স্বামীর সাথে কোন সম্পর্কই রাখেননি এমনকি কোন কথাও বলতেন না।
 সবই ঠিকই চলছিলো।কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো বিয়ের চার বছরের মাথাতেও যখন নমিতাদেবী কোন সন্তান ধারণ করতে পারলেন না।তখনকার দিনে চিকিৎসা শাস্ত্রের এত উন্নতি না থাকলেও বীণাপাণিদেবীর স্বামীর বিয়ের পূর্বে তার ভাই তাকে ডক্টর দেখিয়েছিলেন।কিন্তু ডক্টরের কথা অনুযায়ী তার কোনোই সমস্যা ছিলনা।ডাক্তার পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন তার (ডাক্তারের) যতদূর মনে হচ্ছে উনার স্বামীরই কোন দোষ আছে।কথাটা বাড়িতে জানানো হলে তারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন,"সন্তান ধারণে পুরুষের কোন অক্ষমতা থাকে না।আর সেটা তিনি বিয়ে করেই প্রমাণ করে দেবেন।"
 বিশাল সম্পত্তি অথচ ভোগ করবার জন্য কোন উত্তরাধিকার এলো না।তাহলে সম্পত্তি এবার ভাগ বাটোয়ারা করে দিতে হবে দুই বউ আর ছেলের মধ্যে।নমিতাদেবীর কেউ নেই সুতরাং তিনি মারা গেলেও এই সম্পত্তি থাকবে প্রহ্লাদবাবুর হেফাজতেই।কেউ তো আর নিজের মৃত্যু আগে হতে পারে এটা কোনদিন ভাবে না।তিনিও ভাবেননি।কিন্তু বীণাপাণিদেবীকে সম্পত্তি দিলে তার অবর্তমানে সেই সম্পত্তির অধিকারী হবে তার ভাইপো। প্রহ্লাদবাবু কিছুতেই চান না তার বড় বউকে কোন সম্পত্তি দেওয়া হোক।তার বাবা,মা এ কথা জানতে পেরে ছেলেকে জানালেন সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারার ব্যাপারে সে যদি কোন নাক গলায় তাহলে সমস্ত সম্পত্তি  বড় বউয়ের নামেই তারা করে দেবেন।সংসারে তখন আবার আগুন জ্বলতে লাগলো।আর ঠিক এই সময়ে বীণাপাণিদেবী বেড়াতে এসেছিলেন তার ভাইয়ের বাড়িতে।তিনি বাড়ি ফিরে সব জানতে পেরে তার শ্বশুরকে অনুরোধ করেন তাকে যেন কোন সম্পত্তি না দেওয়া হয়।আর এও বলেন তার ভায়ের যে সম্পত্তি আছে তার হয়তো অর্ধেক আপনাদের আছে।আমার ভাইপো কোনদিনও এই সম্পত্তির ভাগ নিতে আসবে না।আপনার ছেলের যখন এতই ভয় আপনি আমাকে আপনাদের সমস্ত সম্পত্তি থেকে রেহাই দিন।আর কতদিনই বা বাঁচবো।এই সম্পত্তি,বাড়ি,ঘর কোনকিছুর প্রতিই আমার কোন লোভ নেই।শুধু এইটুকু অধিকার আমাকে দিয়ে যান আমি যে কটাদিন বাঁচবো যেন এই বাড়িতেই থাকতে পারি।কোনদিন যেন আমাকে আমার ভায়ের বাড়িতে গিয়ে উঠতে না হয়।
 নারী জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্বামী।তাই যখন আমি অন্যের হাতে তুলে দিতে পেরেছি আমার আর কোন কিছুতেই কোন লোভ নেই।
  বিনাপানিদেবী স্বামীর পরিবারেরই এক আত্মীয়ের একটি মেয়েকে খুব ভালোবাসতেন।নামটি ছিল তার গীতা।শ্বশুর শ্বাশুড়ির মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর বাদে তার মৃত্যু হয়।তিনি তার পালিত কন্যা গীতাকেই বলে গেছিলেন তার মৃত্যুর সময় মুখে জল দিতে ও তার শ্রাদ্ধ করতে।গীতা সে কথা অতি নিষ্ঠাভরে পালন করেছিল।
 বিনাপানীদেবী তার মানসিক অসীম শক্তি বলে নিজের শত দুঃখ,কষ্ট বুকে চেপে রেখে স্বামীর সাথে সংসার করতে না পারলেও শ্বশুরের ভিটেতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।আজ থেকে বেশ কয়েক যুগ আগে পিছিয়ে গিয়ে বলতেই পারি " আদর্শ ভারতীয় বাঙ্গালী নারী।"

ক্রমশঃ 

Wednesday, October 27, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (সপ্তম পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (সপ্তম পর্ব)
   সায়নী তার বাবুর কাছে চিঠিটা নিয়ে যায়।কিন্তু তিনি মেয়ের চিঠি পড়তে অস্বীকার করেন।সায়নী তখন পুরো ঘটনাটা তার বাবাকে খুলে বলে।চিঠিটা তার নামে আসলেও আদতে চিঠিটা দিপালী নামে অন্য কোন মেয়েকে লেখা।মেয়ের কথা শুনে তিনি কিছুটা সময় দম মেরে বসে থাকেন।ঝানু উকিলবাবুর বুঝতে একটুও সময় নিলো না যে মনোতোষ দুই দুটি মেয়েকে বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েই একসাথে নাচিয়ে গেছে,এবং এখনো সেটা চালিয়ে যাচ্ছে।চিঠির ভাষাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যেহেতু দিপালী মেয়েটি কায়স্থ আর এই কারণেই ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে মনতোষের বাবা,মায়ের আপত্তির কারণেই সে দিপালীকে বিয়ে করতে পারেনি।আর এদিকে বাবা,মা তার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগায় এবং তারা অমরেন্দ্রনাথ বাবুর মেয়েটি পছন্দ করায় সে বাধ্য হয়ে বিয়েতে মত দেয়।আর আশীর্বাদের দিন সে তার মোক্ষম চালটি মারে।সে স্বপ্নেও ভাবেনি শেষমেষ অমরেশবাবু রাজি হবেন।কিন্তু ভালো মানুষের মুখোশটা যাতে না খুলে যায় তারজন্য অমরেন্দ্রনাথ বাবুর সাথে ওই আলাপচারিতা করেছিলো।আর এখন একইভাবে একই জায়গায় বসে সায়নী আর দিপালী দুজনকে চিঠি লিখে আগেই খামের উপর ঠিকানা রেডি করে যখন চিঠি দুটি খামে ভরতে যায় তখনই সে তার অন্যমনস্কতায় একের চিঠি অন্যের ঠিকানা লেখা খামে ভরে ফেলে।এইরূপ একটি ছেলের সাথে তিনি কি করে তার সানুর বিয়ে দিলেন সেটাই এখন বুঝে উঠতে পারছেন না।
  এখনকার দিনের মত তখনকার দিনে ডিভোর্স কথাটা এত সহজে উচ্চারিতই হত না।সমাজ এটাকে ভালো চোখে দেখতো না।যদিও সমাজের তোয়াক্কা তিনি কোনদিনই করেননি তবুও তার স্ত্রী এটা যে কিছুতেই মেনে নেবেন না এটা তিনি ভাবেই জানতেন।তিনি তার মেঝমেয়েকে গ্রামের বাড়ি তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।আর এই সমুহ বিপদের ব্যাপারে তিনি নানান চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন কিভাবে এর মোকাবেলা করবেন।
  এদিকে ভারতী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেই স্কুলেএকটা চাকরি পেয়ে গেলো কিন্তু বাড়ি থেকে অনেকটাই দূরত্বে।মালতীর তখন ক্লাস টেন।বাড়িতে তখন পাড়ারই অবস্থাপন্ন চ্যাটার্জী পরিবারের একটি ছেলে আসতো নাম যার দেবদাস চ্যাটার্জী।না পাঠক এ দেবদাস কথাশিল্পীর দেবদাস নয়।মনেমনে সে মালতীকে ভালোবাসলেও কোনদিন তার প্রকাশ ছিলো না। মালতী মাধ্যমিক পাশ করে শহরে চলে আসে।অমরেশবাবুর প্রতিটা মেয়েই গ্রামের থেকে পাশ করে শহরে এসে কলেজে ভর্তি হয়।এদের মধ্যে ব্যতিক্রম শুধুমাত্র তার ছোট মেয়ে ও একমাত্র ছেলেটি।একটি ছেলে সন্তানের আশায় পরপর ন'টি মেয়ে।ছেলের জন্মের সময়ও সকলেই ভেবেছিলেন এবারেও বুঝি মেয়েই হবে।তাই বাড়ির সকলেরই মন খুবই খারাপ ছিল।এর আগে অবশ্য একটি ছেলে হয়েছিলো।কিন্তু পাঁচ বছর বয়সে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়।তখন বাড়ির প্রত্যেকেই শোকে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন।
 যাহোক সকলের শেষে যখন পুনরায় একটি পুত্রসন্তান হল তখন রায় চৌধুরী বাড়িতে আনন্দের হাট।কিন্তু তার মুখেভাত দেওয়া হল গোবিন্দ মন্দিরে।আগের পুত্রটির মুখেভাতে দু থেকে তিন গ্রামের লোকজনকে ভুরিভোজ করানো হয়েছিল।কিন্তু তার অসময়ে চলে যাওয়ার ফলে রায় চৌধুরী বাড়ি থেকেই মুখেভাতে আয়োজন উঠেই গেলো।তখন অবশ্য রঙ্গিলিবালাদেবি বেঁচে ছিলেন।তিনিই এ নিয়মটি চালু করেছিলেন।আর মেয়েদের কখনোই জাকজমোক করে মুখেভাত হয়নি।তার বক্তব্য ছিল মেয়েদের জন্মদিন,মুখেভাতে আড়ম্বর করলে বিবাহিত জীবনে সে মেয়ে সুখী হয়না।
 আসলে তখনকার দিনে প্রতি পদেপদে সংসারে মেয়েদের নানানভাবে বঞ্চিত করা হত।আজও অনেক সংসারে এ ধারা অব্যহত রয়েই গেছে।তবে আগের তুলনায় অনেক কম।
  যাহোক মালতী মাধ্যমিক পাশ করে শহরে এসে যখন ভর্তি হল তখন অমরেশবাবুর এক মুহুরীর (এখন অবশ্য মুহুরী কেউ বলে না তাকে অ্যাসিস্টেন্ট বলে থাকে।কিন্তু তখনকার দিনে মুহুরীই বলা হত) বড় ছেলে প্রায়ই তার বাবার খাবার নিয়ে অফিস টাইমে অমরেশবাবুর বাড়িতে আসতো।খুব সকালে তিনি টিফিন করেই অমরেশবাবুর বাড়িতে এসে তার চেম্বার খুলে বসতেন।অমরেশবাবু যখন অফিস যেতেন তখন তার সাথেই মুহুরী অমল পাল একই সাথে কোর্টে যেতেন।এই অমল পালের ছেলে অভয়ানন্দের প্রেমে পড়ে মালতী।
 দেবদাস চ্যাটার্জীর মালতীর প্রতি ভালোবাসাটা ছিল এক তরফা।শান্তিদেবী ব্যাপারটা জানতেন।কিন্তু সাহস করে কোনদিন স্বামীকে বলে উঠতে পারেননি।তার পছন্দের সব চেয়ে বড় কারন ছিল যেটা অবস্থাপন্ন বামুন ঘরের ছেলে।কিন্তু এদিকে অমরেশবাবু ছেলেটিকে তার নরম স্বভাবের জন্য ভালোবাসলেও এই বেকার ছেলেটির সাথে তার মেয়ের সম্মন্ধ হলে মেনে নিতেন না।অপরদিকে অমল পালের ছেলেটিকে তার খুবই ভালো লাগতো।কিন্তু তখনো পর্যন্ত তিনি তাকে জামাই করার স্বপ্ন দেখে পারেননি।
 অভয়ানন্দ আস্তে আস্তে রায় চৌধুরী বাড়ির ছেলের মতোই হয়ে উঠতে লাগলো।কারণে,অকারণে,প্রয়োজনে,অপ্রয়োজনে সে এ বাড়িতে নিত্য দুবেলা যাতায়াত করতে লাগলো।এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন আর সেটা হল অমরেশবাবু শহরে জমি কিনে মাথা গোঁজার মত ঠাঁই ততদিনে করে ফেলেছেন।কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এই জমি সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি এক মস্তবড় সমস্যায় পড়েন।জমির মালিক এই একই জমি দুজনের কাছে বিক্রি করেন।আইনের পথ ধরে প্রথম বিক্রয় যার কাছে হয়েছিল সেই হিসাবে তিনি এ জমির অধিকার পেয়ে যান।কিন্তু এই প্রথম তার শত্রু জন্ম নিল এই বিষয়কে কেন্দ্র করে।
  মনোতোষের খোঁজ খবর নিয়ে তিনি তার সায়নীকে মনোতোষের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।এর আগে অবশ্য প্রথমে টেলিগ্রাম তারপর চিঠির মাধ্যমে তার সাথে কথা বলে তিনি মেয়েকে একজন পরিচিত মানুষের সাথে তার কাছে পাঠিয়ে দেন।মনোতোষ তখনো ফ্যামিলি কোয়ার্টার সেখানে পায়নি।তাই ওখানে থাকতে থাকতে আত্মীয়ের মত হয়ে যাওয়া এক পরিবারে সায়নীর আশ্রয় হয়।মাঝে মধ্যে মনোতোষ সেখানে আসে আর চেষ্টা করছে নাকি কোয়ার্টার পাওয়ার।এখানেও সেই একই জিনিষ সায়নীর কপালে ঝুঠলো।দিনরাত বাড়ির কাজের মেয়ের মত পরিশ্রম।এবার আর সে তার বাবুকে কিছু না জানিয়ে নিজেই সবকিছু ঠিক করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।একদিন মনোতোষ আসলে সে সরাসরি জানায় কোয়ার্টার যেহেতু সে পাচ্ছে না তাকে যেন সাতদিনের মধ্যে ঘরভাড়া করে মনতোষ এখান থেকে নিয়ে যায়।অন্যথায় এখনকার সমস্ত ঘটনা সে তার বাবুকে জানাবে।আর এবার যদি সে সংসার করতে না পারে তাহলে তার যতদূর মনেহয় বাবু মনোতোষকে এত সহজে ছাড়বেন না।সরকারি চাকরি করা মানুষ কিভাবে তার বিবাহিত স্ত্রীর উপর অন্যায় অত্যাচার করতে পারে আর এটা করলে কি কি একশন নেওয়া যায় তাও মনোতোষকে সায়নী স্মরণ করিয়ে দেয়।
 মনোতোষ ঠিক পনেরদিনের মধ্যেই তাকে ঘরভাড়া করে নিজের কাছে নিয়ে যায়।কিন্তু মনোতোষের কাছে গিয়েই যে সে সুখী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তা কিন্তু নয়।সায়নীর জীবনে সুখ এসেছে বেশ কয়েক বছর পরে।তারজন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।অনেক অপমান,লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে।কিন্তু পরবর্তীতে সে তার জীবনের কোন দুঃখের কথায় তার বাবু মা মায়ের সাথে কোনদিন শেয়ার করেনি।

ক্রমশঃ 

Monday, October 25, 2021

অপেক্ষার আত্মতৃপ্তি

অপেক্ষার আত্মতৃপ্তি
  রোজের মত আজও দুপুরের দিকে একটা খাবারের প্যাকেট আসলো।যুথিকাদেবী মনেমনে বললেন,' আজও মায়ের সাথে দেখা না করে চলে গেলি বাবু?' বলেই তিনি খাবারের প্যাকেটটা খুলে খেতে শুরু করলেন।ভাতের উপর টপটপ করে চোখের জল পড়ছে আর বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলে চলেছেন,' রোজ রোজ খাবার না পাঠিয়ে যদি একবার এসে দেখা করতিস সোনা তাহলে তোর এই অভাগা মা সবচেয়ে বেশি খুশি হত।'
  বছর খানেক আগে দুপুরের দিকে দেবেশ যখন অফিসে তখন যুথিকাদেবীএকমাত্র ছেলের বউয়ের কুকীর্তি দেখে ফেলেন।এই সময়ে সাধারণত তিনি ঘরের বাইরে আসেন না।কিন্তু সেদিন জলের জগে জল না থাকার দরুন ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ বৌমার ঘর থেকে হাসির আওয়াজ শুনে ভেবেছিলেন তার বাবু ওরফে দেবেশ বুঝি অফিস থেকে ফিরে এসেছে এই অসময়ে।তাই তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়েই 'বাবু বাবু' বলে বেশ কয়েকটা ডাক দেন।ভিতর থেকে তখন কথা ও হাসির আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়।তখন তিনি 'বৌমা বৌমা' বলে অনেক ডাকাডাকির পর ভিতর থেকে তার আদরের বৌমা অভিনয়ের মত ঘুম জড়ানো গলায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"আমি ঘুমাচ্ছি এখন।পড়ে শুনবো আপনার কথা।"
 বৃদ্ধা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে আসেন।কিন্তু মনটা তার খুঁতখুঁত করতেই লাগে।তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেটের কাছে পাঁচিলের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে অপেক্ষা করতে থাকেন।কিছুক্ষণ পর তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে একটি ছেলে।সে গেট থেকে বেরিয়ে গেলে যূথিকাদেবী বৌমার মুখোমুখি হন।দু এক কথায় ঝামেলা প্রচন্ড শুরু হয়।'বাবু আসলে তাকে সব জানিয়ে দেবো'- এটাই ছিল তার মস্তবড় ভুল যা তিনি তার বৌমাকে বলেছিলেন।
 শীলা ঘরে ঢুকেই তার স্বামীকে ফোন করে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতে থাকে যে দেবেশের মা খামোখা তাকে উল্টোপাল্টা কথা বলেছেন।শীলা এতই কাদঁছিলো সব কথা দেবেশ ভালোভাবে বুঝতেও পারছিল না।তাই তাকে বলেছিলো ,"বাড়িতে গিয়ে সব শুনবো" বাড়িতে এসে যা শুনেছিল তা হল দুপুরের খাবার দিতে দেরি হওয়ায় শ্বাশুড়ী খাবারের থালা তার গায়ের উপর ছুড়ে মেরেছেন আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন।দেবেশ মায়ের কাছে ঘটনার বিবরণ শোনার কোনো প্রয়োজনীয়তা মনে করেনি।তার মা তাকে সেদিনের কোন ঘটনায় জানিয়েছিল না।তার উদ্দেশ্য ছিল বৌমাকে ভয় দেখিয়ে সোজা পথে আনা।
 দেবেশ এই ঘটনার দুদিন পড়ে মাকে নিয়ে মাসীর বাড়ি যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে মাকে বসিয়ে রেখে টিকিট কাটতে যাচ্ছি বলে সেই যে গেল আর ফিরে আসেনি।অনাহারেই বৃদ্ধার দিন কাটতো।কিন্তু রেলে কর্মরত একজন সহৃদয় ব্যক্তি দিনের পর দিন একজন বৃদ্ধাকে একই জায়গায় বসে থাকতে দেখে তার কাছে গিয়ে সব কথা জানতে পারেন।তিনিই নিত্য যুথিকাদেবীর খাবারের ব্যবস্থা করেন।প্রথম প্রথম নিজেই  খাবার বৃদ্ধার সামনে এনে দিতেন।এখন অবশ্য কোন লোক মারফৎ পাঠিয়ে দেন।কারণ প্রথমদিন খাবারের প্যাকেট দেখে বলেছিলেন, "আমার বাবু পাঠালো বুঝি?"আর তিনিও 'হ্যাঁ' বলেছিলেন।শত আঘাত পাওয়া এক মাকে আর আঘাতে জর্জরিত করতে চাননি।আর কটাদিনই বা বাঁচবেন।বাকি জীবনটা ছেলের অপেক্ষাতে নিজ ছেলের পাঠানো অন্ন মনে করে আত্মতৃপ্তিটা নিয়েই থাকুন।

Sunday, October 24, 2021

যদি ফিরে আসে

যদি ফিরে আসে

  বহুদিন পর বাড়ির ছেলে বাড়ি আসছে।আজ প্রায় বছর আট হল সেই যে অসিত বিয়ের দুবছরের মাথায় চাকরির সুবাদে কানাডা চলে যায় তারপর আর বাড়িতে আসেনি।প্রতিবারই বলে পুজোর সময় বাড়ি আসবে কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানায় আসতে পারবে না।অফিস ছুটি দিচ্ছে না।
  কলকাতায় একটি বিদেশি কোম্পানির উচুঁ পোষ্টে চাকরি করতো অসিত পাল।মায়ের ছেলেবেলার বন্ধুর মেয়েকে মা নিজেই পছন্দ করে পাকা কথা দিয়ে তারপর ছেলেকে জানান।ছেলেও না বলতে পারেনি মায়ের মুখের উপর। অসিতের মনে হয়েছিল এতে মা মনে খুব আঘাত পাবেন।বাবার মৃত্যুর পর অনেক কষ্ট করেই অসিতকে তার মা মানুষ করেছেন।লোকের বাড়িতে রান্নাও করেছেন একসময়।আজ তিনি একটু সুখের মুখ দেখেছেন।তাই হয়ত মায়ের মুখের উপর না করতে পারেনি।কিন্তু মন থেকেও বিদিপ্তাকেও মেনে নিতে পারেনি।বিয়ের পর থেকেই একটা ভালোমানুষের মুখোশ পরে মা আর বউয়ের সাথে দুটো বছর কাটিয়েছে।আর তলে তলে চেষ্টা চালিয়ে গেছে বাইরে চলে যাওয়ার।যা মা বা বউ কেউই ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি।অসিত যখন বাইরে চলে যায় তখন বিদিপ্তা পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট।সুন্দর ফুটফুটে ছেলেটি হওয়ার পরেও সে দেশে ফেরেনি।সব সময়ের জন্যই সে অফিসের দোহাই দিয়েই দেশে না আসা করেছে।মাস গেলে ঠিক খরচের টাকাটা মায়ের অ্যাকাউন্টে  সময়মত পাঠিয়ে দেয়।সপ্তাহে দু থেকে তিনবার ফোনও করে।মাঝে মধ্যে তার অফিস টাইমে ভিডিও কল করেও সকলের সাথে কথা বলে।
 মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে মেনে নিতে না পেরেও নিজের অমতে সেই মেয়েকে মায়ের মন রাখতে বাধ্য হয়ে বিয়ে করে শত চেষ্টা করে বিদেশের মাটিতে পারি দেয় নিজের মনে ক্ষোভ নিয়ে - ' মায়ের পছন্দ করা মেয়ে নিয়ে মা নিজেই সংসার করুন,ওই স্বল্প শিক্ষিত মেয়েটাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না।মা একবারও আমার কাছে কিছুই জানতে চাইলেন না?এবার তো তাকে দেখার লোক এসেই গেছে আমি আমার নিজের মত করেই জীবনটা কাটাবো অথচ কিছুই কেউ বুঝতে পারবে না।"
 কানাডা পৌঁছানোর দুবছরের মাথায় একই অফিসে কর্মরত প্রবাসী সুনীল বোসের নজরে আসে সে।সুনিলবাবু তাকে নিজের বাড়িতে প্রায়ই নিমন্ত্রণ করতেন এই কারণেই অসিতকে তার বড় মেয়েটির সাথে বিয়ে দিয়ে বড় জামাই করার এক অদম্য ইচ্ছায়।অসিত অজান্তেই তার ফেলা টোপটা গিলে ফেলে।দুবছরের মাথায় পায়েলের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়।সে সুনীল বোসকে জানিয়েছিল দেশে তার নিজের বলতে কেউই নেই।কোনদিন দেশে ফেরার ইচ্ছাও নেই।
 সকাল থেকেই বিদিপ্তা আর তার শ্বাশুড়ী অসিতের প্রিয় খাবারগুলো করতে ব্যস্ত।সাত বছরের অয়ন বারবার মা,ঠাকুমার কাছে জানতে ছুটে আসছে "বাবার আর কত দেরি হবে আসতে?বাবা কখন আসবে?" আর মাঝে মাঝেই ছুটে চলে যাচ্ছে ঘরে বড় করে বাঁধানো বাবা,মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে।
  আজও অয়ন মাঝে মধ্যেই বাবা,মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবে বাবা কেন এমন করলেন আমাদের সাথে?এখন তার বয়স আঠারো বছর।মায়ের লাল সিঁথিটার দিকে তাকিয়ে মনে আসা সব প্রশ্নের উত্তর নিজেই খোঁজার চেষ্টা করে।ঠাকুমা মৃত্যুর সময় বারবার করে বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন আজও চোখ বুঝলে অয়ন দেখতে পায় - অত কষ্টের মাঝেও মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,"ওকে ক্ষমা করে দিও বৌমা।একদিন না একদিন ও ঠিক ফিরে আসবে তোমার কাছে।"
 বলাবাহুল্য অসিত সেদিন আসেনি শুধু না ; সেদিনের পর থেকে বিদিপ্তাদের সাথে সম্পর্কও ছিন্ন করেছে।
 
 বিদিপ্তা আজও একমাথা সিঁদুর নিয়ে অসিতের অপেক্ষায় যদি সে ফিরে আসে।


 

সব স্বপ্ন পূরণ হয় না

সব স্বপ্ন পূরণ হয় না
"এমনই ভারী বর্ষার দিন ছিল সেটা,কত স্বপ্ন ছিল মনে...কিন্তু মুহূর্তের মাঝে সব স্বপ্ন ঝড়ের সাথে সাথে উড়ে গেলো।কোনদিন ভাবতেই পারিনি আমার জীবনে এরূপ একটি অঘটন ঘটতে চলেছে।"
  প্রথম যেদিন কুশলের সাথে আমার পরিচয় সেদিন পুরো কলকাতা শহর ছিল জলের তলায়।প্রায় দুঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম কলেজ স্ট্রিটের একটি দোকানের সেডের নিচে।ভিজে পুরো চুপসে গেছিলাম।শুধু আমিই নই ওখানে যারা যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা প্রত্যেকেই।বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই যেন হঠাৎ করে আসা এই মুসলধারে বৃষ্টি।ট্যাক্সি,উবের সব বন্ধ।দু একটি বাস যা চলছে তাতে পা দানিতেও পা রাখার জায়গা নেই।একে একে সেডের এবং আশেপাশের সমস্ত দোকানগুলোর জমায়েত জায়গাগুলি ফাঁকা হতে লাগলো।আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল কুশল।তখনো আমি অবশ্য ওর নামটা জানতাম না।হঠাৎ অপরিচিত ছেলেটি আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
-- আপনি তো একেবারেই ভিজে গেছেন।কফি হাউজের ভিতর গিয়ে শাড়ীটা একটু নিংড়ে নিন।আর যদি আপত্তি না থাকে চলুন দুজনে এক কাপ করে কফি খেয়ে নিই।
 মনেমনে ভাবলাম লোকালয়ে অযাচিতভাবে এভাবে আমার ভালো চাওয়া মানুষটি খুব একটা খারাপ হবে না।রাজি হয়ে গেলাম।সেদিন কথায় কথায় অনেক কথাই জানলাম আর বললাম। ব্যাংকে চাকরি করেন,বাবা নেই - মা আর সে।সেই শুরু।প্রথমে ফোনে তারপর সপ্তাহে দু একদিন দেখা করা।বেশ চলছিলো।একদিন ওর বাড়িতে নিয়ে গেলো ওর মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।তিনিও খুব ভালো মানুষ।দুবাড়িতেই আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিল।
  হঠাৎ করেই হল ওর মাতৃবিয়োগ। ফোনে আমাকে জানিয়ে ছোট শিশুর মত ভীষণ কান্নাকাটি করতে লাগলো।আমার বাবা সবকিছু জেনে আমায় নিয়ে ওদের বাড়িতে গেলেন।আত্মীয়স্বজন বলতে এক বিধবা মামী আর তার বিয়েদারি মেয়ে।তারাও আমাকে মুহূর্তের মাঝে আপন করে নিলেন।দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেলো।
  বিয়ের দিন ঠিক হল।বিয়ের দিন সকালে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবশী ভর্তি বাড়ি।সকলেই হৈ হট্টগোলে সামিল।সেদিন সকাল থেকেই ছিল আকাশের মুখ ভার।চারিদিক এমনভাবে অন্ধকার করে নিয়ে এসেছিল বাইরের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল যেন চারিদিকে কেউ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।ওদের বাড়ি থেকে হলুদ নিয়ে এসে পৌঁছাল প্রায় সন্ধ্যার দিকে।হুগলি থেকে কলকাতার এই দূরত্ব - কিভাবে বরের গাড়ি আসবে এটা নিয়েই আমার বাবা,মা আত্মীয়দের চিন্তা।সেদিন দুটো লগ্নে বিয়ে ছিলো।একটা ছিল সন্ধ্যা লগ্নে অপরটা রাত তিনটের পর।আমার বিয়ের সময় ছিল সন্ধ্যা লগ্নে।কিন্তু সবাই বুঝেই গেছিলাম সন্ধ্যা লগ্নে বিয়ে হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।সবাই পরের সময়টার অপেক্ষায় ছিল।আমি কনে সেজে সেই বিকেল থেকে বসে।বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে।সমানে ঠাকুরকে ডেকে চলেছি।রাত বারোটা কিন্তু কোথায় বরবেশি কুশল?বাড়ি তখন ফাঁকা হতে শুরু করেছে।খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া তখন আর কেউ নেই।বাবা পাগলের মত ছটফট করছেন।মা ঠাকুরঘরে পরে আছেন।আর আমার কথা নাইবা বললাম।
  ভোরবেলা সেই বৃষ্টি থামলো।কাছের যারা ছিল সবাই যে যার মত গাড়ী,বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলো।পুরো চব্বিশ ঘণ্টা পাগলের মত ছোটাছুটির পর বাবা গিয়ে মর্গে কুশলের লাশ সনাক্ত করলেন।বিশাল এক্সিডেন্ট!
 বিয়ে না হয়েও আমি বিধবা হলাম।বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দেবো মনে করে বাবা,মায়ের মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাহাড়ে চলে এসে এখানেই এই বাচ্চাগুলোর দেখাশুনার দায়িত্বে আছি।
 এতক্ষণ ধরে আমি আমার কলিগের সাথে আমার জীবনের কথাগুলো শেয়ার করছিলাম কারণ অনিন্দ্য আমাকে তার ভালোবাসার কথা জানিয়েছে।আমি যে জীবনে আর কাউকেই স্বামী হিসাবে মেনে নিতে পারবো না,কাউকে ভালোবাসতে পারবো না এটা পরিস্কার করে অনিন্দ্যকে জানিয়ে দেওয়ায় শ্রেয় মনে করলাম।
    

Thursday, October 21, 2021

জীবনের প্রতি বাঁকে (ষষ্ঠ পর্ব)

জীবনের প্রতি বাঁকে (ষষ্ঠ পর্ব)
  সায়নী তার শ্বশুরবাড়ি পা দিয়েই বুঝতে পারলো তার শ্বশুর,শ্বাশুড়ী মন থেকে মেনে নিতে তাকে পারেনি।কারণ এ বিয়েকে কেন্দ্র করে আত্মীয় ও পাড়া প্রতিবেশিদের মাঝে যে গুঞ্জন উঠেছিল তার রেশ ধরেই কথায় কথায় তাকে নানান কটূক্তি শুনতে হচ্ছে।নূতন বউ সুতরাং সেভাবে মনোতোষকেও সেভাবে কিছু বলতে পারছে না।আর বাপের বাড়িতে তো নয়ই।মনেমনে ভাবলো যাকগে বেশিদিন এই কথার ঝাল তো মেটাতে পারবে না কারণ মনোতোষের ছুটি শেষ হলেই তো সে তার কর্মস্থলে চলে যাবে।আর সঙ্গে সেও।কিন্তু ভাবনার সাথে বাস্তবের মিল অনেক সময়ই পাওয়া যায় না।এখানেও ঘটলো ঠিক তাইই।মনোতোষ তার বউকে নিয়ে যেতে চাইলে তার বাবা,মা রাজী হননা।তারা তাদের ছেলেকে বলেন,
-- সবে তো বিয়ে করলি। ওতো তোর কাছেই থাকবে সারাজীবন।কয়েকটা দিন আমাদের কাছে রেখে যা।পরেরবার এসে সাথে করে নিয়ে যাস।
 মনোতোষ বাবা,মায়ের কথাটা যুক্তিসঙ্গত মনে করায় সানুর শত কান্নাকাটিতে সে সায় দেয় না।সে একাই দন্ডকারন্য তার কর্মস্থলে ফিরে যায়।আর এর ফলে সায়নীর প্রতি মনোতোষের বাবা,মায়ের সকলের কাছে হেনস্থা হওয়ার রাগ গিয়ে পড়ে।তখনকার দিনে ফোনের এত রমরমা ছিলনা;যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম চিঠির আদানপ্রদান।কিন্তু নূতন বউ বাইরে বেরতেও পারবে না বা তারা বেরোতেও দেবে না।অত্যাচারের মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই যেতে লাগলো।
 একদিন অফিস ফেরত পথে অমরেশবাবু মেয়েকে দেখতে আসায় সায়নী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।কিন্তু বাবা আর মেয়ে যাতে একসাথে আলাদা কথা বলতে না পারে তারজন্য মনোতোষের বাবা,মা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।কিছুটা হলেও অমরেশবাবু বিষয়টা আঁচ করতে পারেন।শত হোক উকিল মানুষ তিনি।কেউ হা করলে তিনি হাওড়া, হাবড়া পৌঁছে যান।ইশারায় মেয়েকে বুঝিয়ে দেন লিখে দিতে।সায়নী চা করতে করতেই রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একটি চিরকুটে লিখে নেয় " বাবু ওরা আমার প্রতি খুব অন্যায়,অত্যাচার করে"। চা টা রাখতে এসে প্লেটের তলায় তার বাবুর দিকে চিরকুটটা রাখে।তিনি চা,জলযোগ করে বাথরুমে যাওয়ার নাম করে চিরকুটটা নিয়ে উঠে যান।চিরকুটটা পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথা গরম হয়ে যায়।ওখানে দাঁড়িয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি তার মেয়েকে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন।
 ঘরে ঢুকেই তিনি তার বেয়াই,বেয়ানকে প্রস্তাব দেন তিনি মেয়েটিকে সাথে করে কয়েকটা দিনের জন্য নিয়ে যেতে চান।সঙ্গে সঙ্গেই তারা সে প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।কিন্তু অমরেশবাবু তার সিদ্ধান্তে অটল।তিনি তার সানুকে নিয়েই ফিরবেন।আর তার শ্বশুর,শ্বাশুড়ীও তাকে তার বাবার সাথে পাঠাবেন না।শেষমেষ তিনি রেগেমেগে বললেন,
--- আমি আমার মেয়েকে নিয়েই বাড়ি ফিরবো তারজন্য যদি তার স্বামী তাকে ত্যাগ করে করবে।তখন আমি আইনের পথেই হাঁটবো।ছেলের বিয়ে দিয়ে পুত্রবধুকে ছেলের সাথে না পাঠিয়ে তাকে বাড়িতে রেখে তার প্রতি যে অন্যায় অত্যাচার করছেন আপনাদের কোন ধারণা আছে আমি তারজন্য আপনাদের বিরুদ্ধে কি কি করতে পারি।
 সায়নীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-- মা তুই রেডি হয়ে চলে আয়।আমি তোকে নিয়েই ফিরবো।
 সায়নী আমতা আমতা করতে লাগলে তিনি বলেন,
--- তোর কোন ভয় নেই।তোকে বিয়ে দিয়েছি স্বামীর সাথে সংসার করার জন্য।আর এরা তোকে তার সাথে না পাঠিয়ে তোর প্রতি মানসিক অত্যাচার করছেন।আমি বাবা হয়ে কিছুতেই এটা মেনে নেবো না।
--- আপনি কিন্তু ভুল করছেন বেয়াই মশাই।আজ যদি ওকে সাথে করে নিয়ে যান আমরা কিন্তু আপনার মেয়েকে আর কোনদিন এ বাড়িতে ঢুকতে দেবো না।
--- আমিও কোনদিন আর এ বাড়িতে আমার মেয়েকে পাঠাবো না।আর যদি তাকে পাঠাতেই হয় তাকে তার স্বামীর কাছেই পাঠাবো।
--- আপনার আজকের আচরণের কথা জানতে পারলে মনা কোনদিন আপনার মেয়েকে নিয়ে সংসার করবে না।
--- তাকে তো এটাও জানতে হবে তার প্রতি আপনারা কি অন্যায় করছেন।আমার মেয়ে তাকে কোন কথা জানায়নি ঠিকই কিন্তু আমি তো তাকে সমস্ত কথায় জানাবো।আর আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন আমার মেয়ে খাওয়াপরা আর একটু আশ্রয়ের জন্য কোনদিন আপনাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে না।আমি আমার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তাকে নিজ পায়ে দাঁড় করাবো।
--- এতই যদি আপনার চিন্তাভাবনা তাহলে আমাদের ছেলের সাথে ওর বিয়ে দিলেন কেন?
--- সে ঘটনা আপনারা জানেন না?নাকি সব ভুলে বসে আছেন?আমার সেদিনই বোঝা উচিত ছিলো।যে ভুল সেদিন করেছি তা শুধরানোর সময় এসে গেছে।
  বাকবিতণ্ডা প্রচুর তর্কাতর্কির পর অমরেশবাবু তার মেয়েকে নিয়ে সে স্থান ত্যাগ করেন।পড়ে তাকে নিয়ে যখন গ্রামের বাড়িতে যান তখন তার স্ত্রী শুনে তো থ।সারাজীবনই মেয়েদের কোন কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না।প্রতিটা মেয়ে তাঁর প্রাণ।আর এই কারণেই মেয়েদের বিয়ের কথা উঠলেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে যেতেন।" দুটো ভাত কোলের কাছে নিয়ে আমার মেয়েরা চোখের জল ফেলবে এটা আমি কিছুতেই মেনে নেবো না --"এই ছিল তার বক্তব্য।
 সমস্ত ঘটনা জানিয়ে সায়নী তার স্বামীকে চিঠি লেখে।কিন্তু কোন উত্তর সে পায় না।কয়েকমাসে বেশ কয়েকটা চিঠি দিয়েও যখন কোন উত্তর আসে না তখন অমরেশবাবু মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে পুনরায় কলেজে ভর্তি করে দেন।কিন্তু মনটা তাঁর সব সময়ের জন্যই খুঁতখুঁত করতো মেয়েটার জন্য।মনোতোষ এই ঘটনার পর আর বাড়িতেও আসে না যোগাযোগও করে না।যে ছেলে সায়নীর জন্য এত পাগল ছিল,যে তাকে বিয়ে করার জন্য এত কান্ড করে লোক হাসালো তার চরিত্রের এই দিকটা কেউই কখনোই বুঝতে পারেনি।সায়নী কিন্তু তার স্বামীকে কয়েকদিন অন্তর অন্তর চিঠি লিখেই যাচ্ছে।আর প্রতিদিন প্রতি মুহুর্ত সে অপেক্ষা করে থাকে মনোতোষের উত্তরের আশায়।কিন্তু তার অপেক্ষা অপেক্ষাতেই শেষ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে সে নিজেকে অনেকটাই সামলে নেয়।পড়াশুনায় মন দেয়।দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বছর কেটে যায়।সায়নী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে।কিন্তু চিঠি লেখা তার বন্ধ হয় না স্বামীকে।ইতিমধ্যে এই বিবাহিত সায়নীকে একজন পূর্ব পরিচিত ছেলে বিয়ে করতে চায় যেহেতু সকলেরই ধারণা তার স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়েছে।কিন্তু সায়নীর বাবা পরিস্কার তাদের জানিয়ে দেন সংসার যদি করতেই হয় তাহলে আমার সানু ওই মনোতোষের সাথেই করবে।তারজন্য যতদূর যেতে হয় আমি যাবো।আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করবে ;আর আমি এত সহজে তা মেনে নেবো না। আইনশৃঙ্খলা বলে দেশে একটা কথা আছে।মনোতোষ সরকারি চাকরি করে।আমি আইনের পথ ধরেই সেই পথে এগোবো।আমি এত সহজে সবকিছু ছেড়ে দেবো না।
 তিন বছরের মাথায় মনোতোষের একটি চিঠি আসলো।কিন্তু চিঠি খুলে সায়নী তো অবাক।খামের উপরে তার নাম।অথচ ভিতরে সে যে চিঠিটা লিখেছে এটা তো তাকে লেখা নয়!নামটাও তো তার নয়।কে এই দিপালী?কাকে মনোতোষ এইভাবে চিঠি লিখেছে?তাহলে কি মনোতোষ অন্য কাউকে ভালোবাসে?আর সেই কারণেই তাকে নিতে আসা বা তার চিঠির উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে?চিঠি পড়ে মনেমনে ভাবে বাবুকে কথাটা বলতেই হবে।বাবু ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কেউই করতে পারবে না।আজই রাতে বাবুকে চিঠিটা দেখাতে হবে।

ক্রমশ -
  

Tuesday, October 19, 2021

শুধু একটি রাত

শুধু একটি রাত

" এই দিনটার অপেক্ষা থাকে সারা বছর কিন্তু -"
  তবুও নিজের ইগো ঝেড়ে ফেলে তার কাছে আসতে পারে না।আমি জানি একবার যদি রুপশ্রী সব ভুলে গিয়ে দেবদূতের কাছে ক্ষমা চায়,ক্ষমা চায় বলছি কেন - একবার যদি তাকে আর একটা সুযোগ দেয় তাহলেই কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়ে যেত।কিন্তু কিছুতেই সে মাথা মাথা নোয়াবে না।আসলে তুমিও তো ওই ধরনের।নিজের ভুল কিছুতেই স্বীকার করবে না।"
--- বেশ তো মেয়ের কথা বলছিলে।হঠাৎ আমায় ধরে টানছো কেন?
--- তোমায় ধরে টানছি এই কারণেই এই স্বভাবটা তো সে তোমার থেকেই পেয়েছে।
 অনিন্দ্যবাবু আর কোন কথা না বলে পেপারটা সামনে ধরে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন।আর সেখানেই চুপচাপ রূপশ্রীর মা শ্রীময়ী বসে সাতপাঁচ ভেবে চলেছেন।
 আজ আট বছর হতে চললো রুপশ্রীর বিয়ে হয়েছে দেবদূতের সঙ্গে।বছর চারেক খুব ভালোই ছিলো দুজনে।দেবদূত নামকরা কোম্পানির উচ্চপোষ্টে কর্মরত।বাবা, মা হারা সন্তান সে।আত্মীয় স্বজনেরা দেখেশুনে বিয়ের সম্মন্ধ করেছিলো।তারপর দেবদূত দেখেই ফাইনাল করেছে।রূপশ্রী সাধারণ ভাবে গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করেছিলো।আহামরি সুন্দরী না হলেও কেউ কুৎসিত তাকে বলবে না।তবে রূপশ্রীর গায়ের রংটা চোখে পড়ার মত।দুধে আলতা গায়ের রং তার।সংসারের কাজেও যথেষ্ঠ পারদর্শী।তার চরিত্রের সব থেকে বড় দোষ যেটা -সে তার ভুল বুঝতে পারলেও কখনোই মুখ ফুটে ভুল স্বীকার করে না।'একদম বাপ কা বেটি।'
 একবার পুজোর সময় পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে সেখানে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যায় দেবদূতের অফিস কলিগ অপরিজিতার সাথে।দেখাটা কাকতালীয় হলেও রূপশ্রী নিজের ইচ্ছামত মনের মধ্যে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নেয়।আর সেখানে সে তার যুক্তি,তর্ক দিয়ে দেবদূতকে বলে,
-- তুমি অপরাজিতার সাথে পরামর্শ করেই একই জায়গায় এসেছো।
--- পাগল নাকি তুমি?ও এসেছে ওর হাজব্যান্ড এর সাথে।আর আমি জানবোই বা কেমন করে যে ওরা এখানেই আসছে কলকাতার পুজো ছেড়ে।আর সব থেকে বড় কথা হল এখানে আসার সিদ্ধান্ত তোমার।আমি কিন্তু এবারের পুজোটা কলকাতাতেই কাটাতে চেয়েছিলাম।
  দেবদূতের সমস্ত কথায় অরণ্যে রোদন হয়।ঝামেলার এই শুরু।অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলেও অপরাজিতাকে নিয়ে দেবদূতকে জড়িয়ে নানান কটূক্তি।তারপর রূপশ্রী একদিন সত্যিই ঘর ছাড়ে।দেবদূত শুধু পায়ে ধরতেই বাকি রেখেছিল সেদিন।তার মস্তবড় অপরাধ ছিল সেদিন তর্কাতর্কির মাঝে দেবদূত রূপশ্রীকে বলেছিলো,
--- তুমি একজন মানসিক রোগী ।তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার।
  রূপশ্রী তারপর আর ফিরে যায়নি দেবদূতের কাছে।সব থেকে অদ্ভুত যে ব্যাপারটা দেবদূত প্রতিবছর দশমীর দিনে তার শ্বশুরবাড়িতে আসে।একমাথা সিঁদুর পরে মাকে বরণ করতে যায় রূপশ্রী।দেবদূতের সাথে তার দেখাও হয়।কিন্তু কোন কথা সে বলেনা।সে বসে থাকতেই তার সামনের থেকে গটগট করতে করতে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।অথচ এই দশমীর দিনে বিকেল থেকেই সে সেজেগুজে বারবার জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে উঁকি দিতে থাকে।তাকে দেখলেই বোঝা যায় সে আজ খুব আনন্দে আছে 
 শ্রীময়ীদেবী এবার ঠিক করেন যে ভাবেই হোক দেবদূতকে এক রাত এখানে রাখতেই হবে।
 দেবদূত এবারেও আসে।পূর্ব পরিকল্পনা মত অনিন্দ্যবাবু হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন।শ্রীময়ীদেবী কাঁদো কাঁদো হয়ে দেবদূতকে তার শ্বশুরের কথা চিন্তা করে এক রাত থেকে যেতে বলেন।দেবদূত অনিচ্ছা সত্বেও রাজি হয়।কিন্তু অতিরিক্ত ঘর না থাকায় শ্রীময়ীদেবী যখন দেবদূতকে রূপশ্রীর ঘরে শুতে বলেন সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় 'না।' বাধ্য হয়ে দেবদূত ড্রয়িংরুমের সোফার উপর শোয়।
  সকলে ঘুমিয়ে পড়লে অনেক রাতে পা টিপে টিপে রূপশ্রী দেবদূতের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার গায়ে একটি চাদর দিতে যায়।আর ঠিক তখনি জেগে থাকা আর ঠিক এই প্রতীক্ষাতে থাকা দেবদূত এক টানে রূপশ্রীকে নিজের বুকের উপর টেনে নেয়। মান-অভিমান, ঝগড়া অন্ধকারের মধ্যে মিশে গিয়ে দুটো নরনারী পুনরায় এক হয়ে যায়।

#আজকের_ব্লগিং_সূত্র