সুখের ঘরে আগুন ( অষ্টম পর্ব )
বধূবিদায়ের সময় আগত | বিয়ের পর বাড়ি, আত্মীয়স্বজন ,পাড়াপ্রতিবেশী সকলের চোখে জল থাকে নবপরিণীতা বধূটির আকুল হয়ে কান্না দেখে | কিন্তু শালিনীর চোখে কোন জল নেই | আত্মীয়স্বজন , প্রতিবেশী এ ওর কানে নিচুস্বরে কিসব যে বলে চলেছে তা দেখলে বোঝায় যায় পরনিন্দা , পরচর্চা চলছে | নিলয় এদিকওদিক তাকিয়ে দেখে রিতেশ গাড়ির কাছে দাঁড়ানো আর অদূরে একটি ছোট হাতিতে কিছু ফার্নিচার তোলা হচ্ছে | নিলয় এগিয়ে গিয়ে রিতেশকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে | শেষে রিতেশ এসে হাতজোড় করে শালিনীর বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললো ,
--- আমরা আপনাদের দেওয়া কোন ফার্নিচার নিতে পারবোনা | আমাদের কোন ডিমান্ড ছিলোনা | আমরা আমাদের ঘর নিজেরাই সাজিয়ে নিয়েছি | এই ফার্নিচার নিয়ে গিয়ে রাখার জায়গা আমাদের হবেনা | দয়া করে এগুলো আপনারা পাঠাবেন না |
খুব অবাক হয়ে শালিনীর বাবা বললেন ,
--- কিন্তু এগুলো তো আমি আমার মেয়ের জন্যই তৈরী করেছি |
নিলয় হাত জোর করে বললো ,
--- ক্ষমা করবেন | আমার ঘরে এ ধরণের সমস্ত জিনিসই আছে | দয়া করে আর অনুরোধ করবেন না | আমাদের অনুমতি দিন আমরা রওনা দিই |
সকলকে অবাক করে দিয়ে নিলয় আগেই এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়লো |
একসময় বধূবরণ শেষ হল | শালিনীকে নিলয়ের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল | এমনিতেই নিলয় আর শালিনীর মধ্যে কোন কথা হয়নি আর আজ তো কালরাত্রি | রাতে ইচ্ছা করেই প্রমিতা শালিনীর কাছে শুতে গেলো যদি কোন কথা তার মুখ থেকে বের করতে পারে | কিন্তু না প্রমিতা যে কথাগুলি তার কাছে জানতে চেয়েছে সেগুলি ছাড়া আর একটাও এক্সট্রা কথা শালিনী বলেনি | শেষে যখন প্রমিতা শালিনীকে বলেছে ,
--- আচ্ছা বৌদি , দাদার সাথে তোমার কি কথা হল গো ?
ঠিক তখনই শালিনী পাশ ফিরে শুতে শুতে বলেছে ,
--- ভীষণ ঘুম পেয়েছে গো কাল কথা হবে |
প্রমিতাকে যে শালিনী এড়িয়ে গেছে এটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে | পরদিন বৌভাতের অনুষ্ঠানে শালিনী ও নিলয়কে তার মা যা যা বলেছেন দুজনেই কোন আপত্তি না জানিয়ে চুপচাপ করে গেছে | সন্ধ্যাবেলাতেও অতিথিদের সামনে শালিনী হাসি মুখেই থেকেছে | নিলয় বা শালিনীকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটা একটা লোক দেখানো বিয়ে | মনের মিল হবেনা জেনেও সকলের সামনে অভিনয় করে চলেছে |
সন্ধ্যা থেকেই লোকজন আসতে শুরু করলো | " বৌ দেখতে ভালো হয়েছে -" সকলেই প্রশংসা করলো | নিলয় হাসিমুখে অফিস কলিগদের অভ্যর্থনা জানালো শালিনীর সাথে পরিচয়ও করে দিলো | রাত দশটার পর থেকেই বিয়েবাড়ি ফাঁকা হতে শুরু করলো | ভাড়া করা বিয়েবাড়ি থেকে বাড়িতে ফিরেই নিলয় মাকে ডেকে বললো ,
--- মা ভীষণ টায়ার্ড | আচার-অনুষ্ঠান অনেক হয়েছে আর কিছু আমি করতে পারবোনা | একটু ফ্রেস হবো | আজ কদিন ধরে এই ঝক্কি আমি আর নিতে পারছিনা |
--- ফুলশয্যার ঘরে কিছু নিয়মকানুন থাকে ---
--- অনেককিছু করে ফেলেছো আমি আর কিছু পারবোনা | এবার এই নিয়মের বেড়াজাল থেকে আমায় বেরোতে দাও |
নিলয় তার ঘরের দিকে পা বাড়ালো | ফুলশয্যার খাটে তার নবপরিণীতা বধূটি তখন জড়সড় হয়ে বসা | নিলয় ঘরে ঢুকে তার আলমারি থেকে পাঞ্জাবি , পায়জামা আর একটা তোয়ালে বের করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শালিনীকে বলে গেলো চেঞ্জ করে নিন | আঙ্গুল দিয়ে অ্যাটাচ বাথরুমটা দেখিয়ে দিলো | শালিনী চেঞ্জ করে এসে নিলয়কে কিছু বলবে বলে অনেক রাত অবধি জেগে বসে ছিল তারপর নিজের অজান্তেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে | ভোররাতে ঘুম ভেঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে নিলয় কখন ঘরে এসে সোফার উপর ঘুমাচ্ছে | কিছুক্ষণ খাটের উপর বসে থেকে ঘর থেকে ফ্রেস হয়ে যখন বেরোতে যাবে হঠাৎ করেই তার মনেহল সে বেরিয়ে গেলে কেউ যদি ঘরের ভিতর এসে ঢোকে সেতো দেখতে পাবে নিলয় সোফার উপর ঘুমাচ্ছে | হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তখন | সেও খাটের এককোনে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে থাকে নিলয়ের ঘুম ভাঙ্গার |
নিলয়ের যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন প্রায় সাতটা | একমাত্র শ্বশুরমশাই ছাড়া নিকট আত্মীয়রা সবাই উঠে পড়েছে | শালিনীকে আসতে দেখেই তার শ্বাশুড়ি বললেন , " তুমি চেয়ারে গিয়ে বসো তোমার চা নিয়ে আসছি "|
--- না না আমি নিজেই করে নেবো | আপনি আমাকে একটু সব দেখিয়ে দিন কোথায় কি আছে ?
--- সারাজীবন তো নিজেই করে খাবে মা | অষ্টমঙ্গলটা যাক | তারপর নাহয় কাজে হাত লাগিও |
শালিনী কোন কথার উত্তর করেনা | এদিকে প্রমিতা বৌদিকে বাইরে দেখতে পেয়েই দাদার ঘরে গিয়ে ঢোকে | গিয়ে দেখে দাদা বাথরুমে | অপেক্ষা করতে থাকে | কিছুক্ষণ পরে দাদা বেরিয়ে আসলে উৎসুক দৃষ্টিতে দাদার দিকে ফিরে জানতে চায় ,
--- সবকিছু ঠিক আছে তো রে --
--- কি ঠিক থাকবে ? কিছু ঠিক থাকবে না জেনেই তো বিয়েটা করা |
--- আর হেঁয়ালি ভালো লাগছে না সবকিছু খুলে বল এবার |
--- যেকোন সময় শালিনী এসে যাবে | আজ রাতে আমি, তুই , আর রিতেশ খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে গিয়ে সবকথা বলবো | কিন্তু খুব সাবধান বাড়ির কেউ যেন না জানে | যতক্ষণ পর্যন্ত না সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারছি তৎক্ষণ পর্যন্ত মা বাবাকে কিছুটি জানাবো না | অবশ্য যখনই তারা জানতে পারবেন তখনই ভীষণ আঘাত পাবেন | কিন্তু কিচ্ছুটি আমার হাতের মধ্যে নেই | সুখী হতে পারবো না জেনেও বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি কিন্তু তবুও বাবা , মাকে শান্তি দিতে পারলাম না | তাদের পছন্দ করা মেয়েকে মেনে নিয়েই তাদের খুশি করতে চেয়েছি কিন্তু সবকিছুই কেমন ওলটপালট হয়ে গেলো |
ক্রমশঃ-
No comments:
Post a Comment