Wednesday, April 8, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১২ পর্ব)

 ভালোবাসার নীল আকাশ (১২ পর্ব)

   কৌশিকী, অনলের তার প্রতি এই উদাসীনতায় একদম মুসরে পড়ে। কিন্তু সেটা ভিতরে অনলকে সে কিছুতেই বুঝতে দেয় না কারণ অনলের দিক থেকে কোন সাড়া তার প্রতি ছিল না। আর তাছাড়া বিয়ে বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই সে অনলের ভিতর অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে । কিছু যে একটা তার জীবনে ঘটেছে এটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। এরপর দিন সাতেক অফিস করার পর কৌশিকী চাকরিতে রিজাইন দিয়ে নিজের বাড়ির কাছে শিলিগুড়ির সরকারি স্কুলের চাকরিটাই বেছে নেয়। চলে যায় কৌশিকী। কৌশিকীর মনে সবসময় অনল বিরাজ করলেও অনলের মনে সব সময়ের জন্য রয়ে গেছে বিনীতা। 
 ওই ঘটনার পর থেকে বিনীতা আজ প্রায় একমাস হতে চললো অনলের সাথে কোন যোগাযোগই করেনি। প্রথম প্রথম অনলের খুব খারাপ লাগলেও আস্তে আস্তে এটা জীবনের উপর দিয়ে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা বলেই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে অনল। কিন্তু মন মানে কী?
   এরই মাঝে এক রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে ফোন নিয়ে অনল খুটখাট করছিল। হঠাৎ বিজয়ের মোবাইল থেকে বেশ কিছু ছবি অনলের ওয়াটসঅ্যাপে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অনল দেখতে শুরু করে তার বিয়ের ছবিগুলো। ছবি দেখা শেষ করার আগেই বিজয় ফোন করে। অনল "হ্যালো" বলতেই বিজয় বলে ওঠে,
-- তোর জীবনের এই ঘটনার জন্য আমিই একমাত্র দায়ী। আমি জানি না তুই আমাকে ক্ষমা করতে পারবি কিনা, বন্ধু হিসাবে ক্ষমা চাওয়ার কোন মুখ আমার আছে কিনা তাও জানা নেই।
 বিজয়ের কথার মাঝখানেই অনল বলে ওঠে,
-- এই দাঁড়া দাঁড়া কিসব বলছিস তুই? একই বাক্যে একবার বন্ধু বলছিস আর একবার ক্ষমা চাইছিস? তোর দাবিটা কী আমার কাছে? আমাকে কি একটা অমানুষ ভেবেছিস? আর এসব কথা কেনই বা বলছিস? আমি তো এই ব্যাপারে তোকে দায়ী করিনি। এটা আমার কপালের লিখন! তানাহলে এতদিন বাদে তোর সাথে আমার দেখাই বা হবে কেন? 
 বিজয় চুপ করে আছে দেখে অনল আবার বলে,
-- হ্যালো শুনতে পারছিস? 
-- হ্যাঁ শুনছি বল। আসলে সেদিন মায়ের কথাগুলো শোনার পর আমিও পরে ভেবে দেখলাম আমি ঠিক করিনি। আমার বোন যাতে লগ্নভ্রষ্ট না হয় সেদিকটা দেখতে গিয়ে তোর জীবনটাও আমি নষ্ট করে দিলাম।
-- এসব কথা এখন বলছিস কেন? আর বলেই বা লাভ কী? যা হবার তাতো হয়েই গেছে। আমি তো তোর বোনকে বলেই এসেছি যদি ও না চায় তাহলে এই সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারে। আমার দিক থেকে কোন জোর নেই। আমি জানি সেদিন গাড়িতে আমাদের কথা বলার জন্যই তুই সেখান থেকে সরে গেছিলি। আমি তোর বোনকে ফোন নম্বর দিয়ে এসেছিলাম। বলেছিলাম আমাকে ওর নম্বরটা দেওয়ার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে আমায় কোন ফোন করেনি। আমি বুঝতে পারছি সে আমার সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে চায় না। আমি ইচ্ছা করলে তোর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ওকে ফোন করতেই পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করিনি কারণ এই সম্পর্কটা সে রাখবে কি রাখবে না এটা সম্পূর্ণ তার উপর নির্ভর করছে। আমি কোন জোর করবো না কখনো।
-- কেন ও তো তোর বিবাহিতা স্ত্রী। তুই জোর করবি না কেন? উল্টো দিক থেকে ও নিজেও তো এটাই ভাবতে পারে। 
-- সত্যি বলতে কি জানিস বিজয়? আমি বোধহয় ওই কয়েক ঘণ্টায় বিনীতাকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিজের মনটাকে নিজেই বুঝতে পারছি না। আসলে কোনদিন প্রেমে পড়িনি তো।
 কথাটা বলে অনল হেসে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিজয় বলে ওঠে,
-- আমিও এই ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। তাই তোকে কোন হেল্প করতে পারলাম না ওই প্রেমে পড়ার ব্যাপারে আর কী!
 বিজয়ও হাসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে আবার নিজেই শুরু করে 
-- বিনীতা… ও ইচ্ছে করে তোকে এড়িয়ে যাচ্ছে।
অনলের বুকটা যেন হঠাৎ ধক করে ওঠে, -- মানে? কী বলছিস তুই?
-- সেদিন বিয়ের পরদিনই ও আমাকে সব বলেছিল। ও বলেছিল, এই বিয়েটা পরিস্থিতির চাপে হয়েছে। ও তোকে অসম্মান করতে চায় না, আবার নিজের মনকেও ঠকাতে পারছে না। তাই ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তোকে সময় দেবে… আর নিজেও দূরে থাকবে।
অনল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর একটু কঠিন গলায় বলে, -- তাহলে এতদিন যোগাযোগ না করার কারণ এটাই?
-- হ্যাঁ। আর একটা কথা… ও এখন শিলিগুড়ি নেই।
-- কোথায় গেছে?
-- দিল্লিতে। স্কুল ছুটি পড়েছে। আমার এক মাসি থাকেন দিল্লিতে। তাই ঘুরতে যাওয়া একটু আর কি! 
অনলের মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে ওঠে। এতদিন যার একটা ফোনের জন্য প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করেছে  সে এত দূরে… আর ইচ্ছে করেই দূরে!
-- তুই আরও আগে আমাকে কিছু জানাসনি কেন?
বিজয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, -- বলার সাহস পাইনি। সাহস কথাটা ঠিক হল না আসলে সেদিনের হঠাৎ ঘটা ঘটনার জন্য নিজেকে ভীষণভাবে দায়ী মনে হচ্ছিল। সত্যিই তো তোর জীবনের সুন্দর একটা স্বপ্নের মুহূর্ত আমি নষ্ট করে দিয়েছি। তবুও ভেবেছি জানিস ব্যাপারটা হয়ত তোরা দু'জনে মিলে ঠিক করে নিতে পারবি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তোরা দু'জনেই দু'দিক থেকে অদ্ভুতভাবে নীরব! কেউ কারো সাথেই যোগাযোগ করছিস না। আবার এও ভেবেছি সময় দিলেই হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে… কিন্তু আজ তোর ওই ছবিগুলো দেখার পর… আর পারলাম না।
অনল হালকা হেসে বলে, -- মজার ব্যাপার কী জানিস? আমি ভাবছিলাম বিনীতা যখন চুপ করে আছে তাহলে ও হয়ত এই সম্পর্কটা চাইছে না। তাই আমার উচিত দুঃস্বপ্ন ভেবে সবটা ভুলে যাওয়া… কিন্তু যত ভুলতে চাইছি, ততই যেন ওকে বেশি মনে পড়ছে।
-- তুই কী করতে চাইছিস এখন?
অনল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, -- জানি না… কিন্তু একটা কথা বুঝেছি, পালিয়ে গিয়ে কিছু হয় না। ও যদি নিজের মতো সময় নিতে চায়, নিক। কিন্তু আমি আমার দিক থেকে একবার অন্তত চেষ্টা করব।
-- কীভাবে?
-- ওর সাথে কথা বলব। সরাসরি। যা বলার সামনে বসেই বলব।
বিজয় একটু থেমে বলে, -- যদি ও তোকে ফিরিয়ে দেয়?
-- দেবে না। তোর কী মনেহয়? তোরই তো বোন।আমায় ফিরিয়ে দেবে?
-- ও খুব জেদি রে! কারো অনুকম্পার পাত্রী হতে রাজি নয়। আত্মমর্যাদা ওর জীবনে সবচেয়ে উঁচু স্থানে। 
অনল শান্ত গলায় উত্তর দেয়, -- তাহলেও অন্তত আফসোস থাকবে না যে চেষ্টা করিনি।
-- তবে আমি তোর প্রতি আশাবাদী। মা যাই বলুন না কেন আমি জানি সেদিন আমি কোন ভুল করিনি আমার বোনের সারাজীবনের সঙ্গী বাছতে। আমার বোন খুব সুখী হবে। 
অনল চুপ করে থাকে। বিজয় ফোনটা কেটে দেয়। তার মনের মধ্যে একটা খুশির ঝলক দিয়ে ওঠে। আজ অনলের সাথে কথা বলে সে বুঝতে পারে অনলের মনের ভিতর বিনীতা অনেকটা জায়গা নিয়ে বসে আছে। সে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় অনলের সাথে যে তার কথা হয়েছে সেটা জানাতে। সেই মুহূর্তে ছোটমামার ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা কানে ধরে "হ্যালো"বলতেই মামা বলে ওঠেন,
-- তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে রে বিজয়। বিনীতার বিয়েটা যে ঘটক ঠিক করেছিলেন তিনি আজ ফোন করেছিলেন। সেদিন অপারেশন করে অর্পণের শরীর থেকে গুলি বের করার পর বেশ কিছুদিন ও কোমায় ছিল। এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
-- একটা ভালো খবর শোনালে মামা। আমি অবশ্য ঘটককে জানিয়ে দিয়েছি সেদিনই আমার বোনঝির বিয়ে হয়ে গেছে। 
-- আমাদের কি একদিন ওকে দেখতে যাওয়া উচিত?
-- যাবো আমি তুই দু'জনেই  যাবো। এগুলো ভবিতব্য রে! যা হবার তাই হয়েছে। কিন্তু মনুষ্যত্ব বলে একটা কথা আছে। সেই কারণেই দেখতে যাবো।
  
  ফোনটা কেটে যাওয়ার পর অনল জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশটা আজ অদ্ভুত নীল। ঠিক যেন তার নিজের মনের মতো—অস্পষ্ট, অথচ গভীর।
সে নিজের মনেই বলে ওঠে, -- বিনীতা, এবার আর দূরে নয়… যেভাবেই হোক,  আমি একবার তোমার সাথে দেখা করে তোমার মতটা জানতে চাই। আসলে কী চাও তুমি? সামনে থেকে তোমায় কিছু প্রশ্ন করব। যদি তুমি না চাও আমি সরে দাঁড়াবো তোমার জীবন থেকে।
অনলের চোখে যেন নতুন আলো জ্বলে ওঠে।
   হয়তো… আবার একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
জানালার বাইরে আকাশটা আজ সত্যিই অদ্ভুত নীল। যেন ভালোবাসার সেই নীল আকাশ আবার নতুন করে ডানা মেলতে প্রস্তুত ।

ক্রমশ…

Monday, April 6, 2026

ভালোবাসার নীল আকাশ (১১ পর্ব)

ভালোবাসার নীল আকাশ ( এগারো পর্ব)


       ডাক্তার, নার্স ছুটে আসে। সকলে লক্ষ্য করে অর্পণের হাতের আঙুল নড়াচড়া করছে। ডাক্তার জানান অর্পণের জ্ঞান ফিরছে। ময়ূর আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বাইরে ছুটে গিয়ে অর্পিতাকে ফোন করে। অর্পিতা সেই মুহূর্তে হাসপাতালে আসতে চায়। কিন্তু তখন ভিজিটিং আওয়ার শেষ হওয়ার পথে। এখন আসলে সে দাদাকে দেখতে পারবে না তাই বরং আগামীকাল আসাই ভালো হবে। অর্পিতা ময়ূরকে বলে সে যেন ডাক্তারের কাছ থেকে সবকিছু ভালোভাবে জেনে আসে। হাসপাতাল থেকে অর্পিতার বাড়ি হয়ে ফিরতে সেদিন ময়ূরের বেশ রাত হয়ে যায়। ময়ূরের বাড়ির লোক বেশ টেনশনে ছিলেন কারণ কয়েকদিন আগেই এরূপ একটি ঘটনা ময়ূরের জীবনের উপর দিয়ে ঘটে গেছে। সত্যি বলতে ময়ূরের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আগেও যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই অকুতোভয়। কোনকিছুতেই ভয় পাওয়ার মেয়ে সে নয়। 
  আস্তে আস্তে অর্পণের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।লাইফ সাফোর্ট সব খুলে দেওয়া হয়। সে উঠে বসতে পারে। নিজে হাতে খেতেও পারছে। ঠিক সাতদিন পরে অর্পণকে ছেড়ে দেয় হাসপাতাল থেকে। এই কটাদিন ময়ূরের উপর থেকেই যেন ঝড়টা বেশি গেছে। হাপাতাল,বাড়ি,অর্পিতার বাড়ি করতে করতে ময়ূর হাঁফিয়ে উঠেছে। মাঝে মধ্যে আবার স্কুলেও যেতে হয়েছে। আর সেটা সে বাধ্য হয়েই গেছে মা,বাবার মন রাখতে। 
 হাসপাতালে অর্পণের কাছে একটা টুলে বসে চোখ বন্ধ করা অর্পণের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ময়ূরের ভিতরে অর্পণের প্রতি যে ভালোবাসার বীজ সে বপন করেছে তা ধীরে ধীরে শিকড় গজাতে শুরু করেছে। সে এখন রোজ তাদের বাড়িতে না আসলেও মাঝে মধ্যেই অর্পণদাকে দেখতে আসে। আর রোজই সাথে করে নিয়ে আসে মায়ের হাতের কিংবা নিজেই রান্না করে কিছু খাবার।
  অর্পণের সাথে খুব একটা কথা হয় না ময়ূরের। কিন্তু ময়ূর বুঝতে পারে অর্পণ তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। সে এটাও বুঝতে পারে অর্পণের এই ব্যাপারে কোন হেলদোল নেই। মাঝেমধ্যে বোনের সাথে ইয়ার্কি করতে গেলে বোনের বন্ধু অর্থাৎ সেই বোন হিসাবেই ময়ুরকেও বলে,
-- মাথায় এক গাট্টা মারবো। 
 কিংবা কখনো বা বলে,
-- ওহ্ তোরা এত বুঝে গেছিস মনেহচ্ছে তোরা দু'জনেই আমার গার্জিয়ান হয়ে গেছিস। আমি এখন যথেষ্ঠ ভালো আছি। এবার ময়ূরের কেসটা শুরু করবো।
 এ কথা শুনে অর্পিতা, ময়ূর দু'জনেই কেঁপে ওঠে। অর্পিতা অসহায়ের মত ময়ূরের দিকে তাকায়। ময়ূর সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
-- কিন্তু আমি তো কেসটা লড়তে চাই না।
-- মানে? তারমানে তুমি আমায় হেরে যেতে বলছো? যে কেস নিয়ে এত কিছু হয়ে গেলো সেখান থেকে মাথা নিচু করে সরে আসতে বলছো?
-- না আসলে ঘটনাটা তা নয়। সামনেই পরীক্ষা। আর তাছাড়া মা,বাবা তো প্রথম থেকেই চাননি যে কেসটা আমি লড়ি। তাঁরা তো আপনার কাছেও এসেছিলেন যাতে আপনি কেসটা হাতে না নেন।
-- এই দাঁড়াও কেসের প্রসঙ্গে পরে আসছি। তুমি আমায় আপনি বলবে না। তুমি অর্পিতার বন্ধু। আমার বোন কি আমায় আপনি বলে? তুমি করে কথা বলবে। হ্যাঁ এবার বলো কী বলছিলে?
-- সে রকম কিছু নয়। এই সময় এইসব করতে গেলে পড়াশুনায়  মন বসাতে পারবো না। 
-- তুমি কী করবে? কেসটা তো লড়ব আমি 
-- হ্যাঁ সেতো নিশ্চয়। কিন্তু আমাকেও তো মাঝে মধ্যেই হাজিরা দিতে যেতে হবে। আমাকে ছাড়া তো আর কেসটা লড়তে পারবেন মানে পারবে না।
 অর্পণ অবাক হয়ে ময়ূরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম দিন যে মেয়েটার মধ্যে আগুন দেখেছিল সেই আগুন আজ আর নেই। পরিবর্তে সে যখন কথা বলছে তার মধ্যে একটা সলজ্জ ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। অর্পিতার কাছে সে শুনেছে ময়ূর এই ক'টামাস প্রায়ই হাসপাতাল গেছে আর দু'ঘন্টা সময় ওই টুলের উপরে বসেই তার মুখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। অর্পিতা কথা প্রসঙ্গে তার দাদাকে এটাও বলেছে ময়ূরের এই কেসটা নেওয়ার ফলে তাকে যে এই বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে সেটা সবাই জানে। তাই সে তার দাদাকে অনুরোধও করেছে যাতে পুণরায় কেসটা কোর্টে না তোলে। তারমানে অর্পিতা কি কিছু বলেছে ওকে?
 অর্পণ ময়ূরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-- এই তোমাকে কেসটা না করার বুদ্ধিটা দিয়েছে কে? পরিষ্কার করে তার নামটা আমায় বলো শুনি 
-- না না কেউ আমায় নিষেধ করেনি। তখন প্রথম প্রথম আমার প্রচন্ড রাগ ছিল তাই --
 কথা শেষ করার আগেই অর্পণ বলে ওঠে,
-- এখন রাগটা নেই কেন?
 ময়ূর হেসে দেয়। তুমি আমায় যতই বলো আমি আমার পড়াশুনার ক্ষতি করে এই কেস নিয়ে আর মাতবো না। তাছাড়া বাবার সামান্য ইনকাম। টিউশন ফি, সংসার খরচ তার উপর এই কেস কোথা থেকে আসবে এত অর্থ?
-- ওহ্ বুঝেছি। তারমানে প্রথম থেকেই ধরে বসে আছো আমি এই কেস করতে তোমার কাছ থেকে ফি নেবো। আরে না তুমি হচ্ছ অর্পিতার বন্ধু। আমি দাদা হয়ে বোনের কেস লড়তে কি টাকা নিতে পারি? কিন্তু কেসটা আমি লড়বোই। যে কেসের জন্য আমাকে মে"রে  পর্যন্ত ফেলতে চেয়েছে সে কেস আমি এত সহজে ছেড়ে দেবো না।
-- কিন্তু আমি তো কেস লড়বো না। 
 ওদের কথার মাঝে অর্পিতা বলে উঠে,
-- ঘরেই কেসের লড়াইটা চালিয়ে যা আমি চা টিফিনের ব্যবস্থা করি।
 ওখান থেকে ময়ূরও সরে পড়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
-- চল, আমিও তোর সাথেই যাই 
-- এই যাই মানে কী? এখানে বসো।তোমার সাথে আমার কথা আছে।
-- কিন্তু আমার তো কথা শেষ হয়ে গেছে। এবার চা টা খেয়ে বাড়ি যাবো।
-- আমাকে সত্যি করে বলো তো কেন তুমি আর কেসটা লড়তে চাইছো না? আমার এই ঘটনার জন্য?
 অর্পিতা আগেই উঠে চলে গেছে। ময়ূর অর্পণের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলে, 
-- একদম যে তা নয় সেটা মোটেই নয়। সবচেয়ে প্রধান কারণটা হচ্ছে পড়াশুনার ভীষন ক্ষতি হয়ে যাবে। 
 কথাটা মুখে বললেও ময়ূরের অন্তরাত্মা জানে এটা সর্বৈব মিথ্যে কথা। যে ঘটনা ঘটতে চলেছিল তার থেকে বেরোতে পেরে ময়ূর যেন দম ছেড়ে বেঁচেছে। সারাটা জীবন একটা মানুষের মৃত্যুর দায় বহন করে বেড়াতে হত। কী ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল। ঈশ্বর মঙ্গলময় তাই হয়ত এই দায় থেকে ময়ূর নিষ্কৃতি পেয়েছে। 
-- দেখো আমি তোমায় জোর করতে পারি না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে এরূপ ঘটনা ঘটতেই পারে। আমরা যদি ভয়ে সব সময় পিছিয়ে যাই তাহলে তো অন্যায় হতেই থাকবে কোনদিন কোন প্রতিকার হবে না।
  অর্পণের কথাগুলো যেন ঘরের ভেতরের বাতাসকে ভারী করে তুললো। ময়ূর চুপ করে বসে থাকে। তার চোখ নিচু, কিন্তু মনের ভেতর ঢেউ উঠছে একের পর এক।
অর্পণ আবার ধীরে বলে,
— আমি জানি তুমি ভয় পেয়েছো… আর সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি কি সত্যিই চাও, যারা অন্যায় করেছে তারা এভাবে পার পেয়ে যাক?
ময়ূর মাথা তুলে তাকায়। অর্পণের চোখে সে আগের সেই আগুনটাই দেখতে পায়—অটল, দৃঢ়।
কিন্তু আজ সেই আগুনের পাশে একটা মমতাও যেন মিশে গেছে।
— আমি ভয় পাইনি… — ময়ূর আস্তে বলে।
— তাহলে? — অর্পণের গলায় প্রশ্ন।
ময়ূর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— আমি আর কোন ঝামেলায় জড়াতে চাই না, আমি কাউকে হারাতে চাই না… আর বিশেষ করে তোমাকে না।
কথাটা বেরিয়ে যেতেই ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। যেন সময় থমকে গেছে।
অর্পণ স্থির দৃষ্টিতে ময়ূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম সে ময়ূরের চোখের ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করে। সেখানে আর শুধু একটা কেসের লড়াই নেই… আছে গভীর একটা টান, একটা অজানা অনুভূতি।
ঠিক তখনই অর্পিতা ট্রে হাতে ঘরে ঢোকে।
— কি রে, তোরা এত চুপচাপ কেন? মনে হচ্ছে যেন কোর্টের রায় বেরোতে চলেছে!
ময়ূর একটু হেসে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
অর্পণও হালকা গলায় বলে,
— রায় তো একদিন বেরোবেই, … তবে তার আগে লড়াইটাও দরকার।
অর্পিতা দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। সে মজা করে বলে,
— আচ্ছা, তোমরা কেস লড়বে কি লড়বে না সেটা সম্পূর্ণ তোমাদের ব্যাপার। তবে আমার মনেহচ্ছে এবার অন্য একটা কেস ফাইল হতে চলেছে।
ময়ূর লজ্জায় বলে ওঠে,
— আরে চুপ কর না! কী যে বলিস!
অর্পণ হালকা হেসে চা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু তার চোখে একটা নতুন ভাব—যেন সে কিছু বুঝতে শুরু করেছে।
চা খাওয়ার ফাঁকে অর্পণ আবার বলে,
— ঠিক আছে, তুমি এখনই সিদ্ধান্ত নিও না। সময় নাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো… সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোটা কখনো ভুল নয়।
ময়ূর চুপ করে মাথা নাড়ে।
  সেদিন বাড়ি ফেরার পথে ময়ূরের মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা আবার ভারীও লাগে।
রাস্তায় বাতির আলো পড়ছে, হালকা হাওয়া বইছে… কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা নতুন অনুভূতির জন্ম হচ্ছে।
সে নিজের মনেই বলে,
"আমি কি সত্যিই শুধু কেসটা থেকে সরে আসতে চাইছি… না কি আমি ওর জন্য ভয় পাচ্ছি?"
অন্যদিকে, অর্পণও সেই রাতে ঘুমোতে পারে না।
ময়ূরের কথাগুলো বারবার কানে বাজতে থাকে—
"আমি কাউকে হারাতে চাই না… বিশেষ করে তোমাকে না…"
অর্পণ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। বয়সে অনেক ছোট মেয়েটির জন্য অর্পণের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে -।

ক্রমশ