Friday, March 11, 2022

কৃতকর্মের ফল

কৃতকর্মের ফল
  সেই ছেলেবেলা থেকে শ্রেষ্ঠার স্বভাব কষ্ট পেলে দরজা বন্ধ করে কাঁদা।এখন শ্রেষ্ঠার বয়স বাইশ বছর।আজও তার স্বভাবের কোন ব্যতিক্রম হয়নি।
 শ্রেষ্ঠার জন্ম দিতে গিয়ে তার মা মারা যান।হাসপাতাল থেকেই শ্রেষ্ঠা চলে যায় তার মামাবাড়িতে। ছমাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠাকে মানুষ করার অজুহাতে তার বাবা আবার বিয়ে করে আনেন।
  কিন্তু মামাবাড়ি থেকে শ্রেষ্ঠাকে আনার কোন লক্ষণ তার বাবার মধ্যে ছিলো না।বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার স্ত্রী ললিতা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়।আগের পক্ষে কালীপদর যে একটি মেয়ে ছিল বউয়ের আদর,সোহাগ পেতে আর সংসারের সুখ কিনতে কালীপদ ইচ্ছাকৃত তা ভুলেই গেছিল।
  শ্রেষ্ঠা যখন ক্লাস ফোরে পড়ে তখন তার দিদিমার মৃত্যু হওয়াতে তার মামী তাকে রাখতে অস্বীকার করায় মামা একদিন সন্ধ্যার সময় ছেঁড়া এক ব্যাগের মধ্যে কয়েকটি জামাকাপড় আর তার ক্লাসের বইগুলি সমেত শ্রেষ্ঠার বাবার বাড়িতে তাকে পৌঁছে দিয়ে যায়। কালীপদর পক্ষে মেয়েকে চেনা সম্ভব ছিল না তিনি শ্যালককে দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিলেন 
  খাওয়া-পরায় বিনা মাইনের ঝি মিলে গেলো ললিতার।মুখ বুঝে সারাক্ষণ কাজ করলেও উপরি হিসাবে মুখ ঝামটাটা প্রতিক্ষণে পেয়ে যেত।কালীপদ এ ব্যাপারে ছিল অন্ধ। শ্রেষ্ঠা তার বুকের কষ্ট লাঘব করতে ছোট্ট একটা ঘরের এক ভাঙ্গা চেয়ারের উপর বসে চোখের জলে বুকের কষ্ট লাঘব করতো।কোন খাট ছিল না।শীত,গ্রীষ্ম,বর্ষা সিমেন্টের মেঝেতেই মাদুর আর একটা শত ছেঁড়া তোষকের উপর তাকে রাত কাটাতে হত।
  বাইশ বছরের এক মেয়েকে কিছু টাকার লোভে পঁয়তাল্লিশ বছরের এক পৌঢ় এর সাথে বিয়ে ঠিক করে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার দায়িত্ব পালন করতে কালীপদ বিন্দুমাত্র ভাবেনি।
  দুবছর ধরে নিত্য রাতে ধর্ষিতা শ্রেষ্ঠা একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রমেশের কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশের বাড়ির সাহায্যে ডাক্তার এনে জানতে পারে ঘুমের মধ্যে রমেশের মৃত্যু হয়েছে।কারও মৃত্যু যে অন্য কারো জীবনে শান্তির শ্বাস হয়ে আসে আজ শ্রেষ্ঠা তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলো।
 টাকা,পয়সা,সোনাদানা রমেশের কোনকিছুরই অভাব ছিল না।শুধু তিন তিনবার বিয়ে করার পর কোন বউ ই বেশিদিন টেকেনি।একটা ঘর ছেড়েছে রাতের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আর দুজন মারা গেছে।লোকটির কপালে বউ টেকে না!যদিও এবারে শ্রেষ্ঠা টিকে গেলেও সে নিজেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিল।
 জন্মের পর এই প্রথম শ্রেষ্ঠা সুখের মুখ দেখলো রমেশের মৃত্যুর পর।এই ঘটনার বছর তিনেক পর একদিন সন্ধ্যার সময় তার বাবা একটি ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে তার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়।
 বাবার কাছ থেকে জানতে পারে তার সৎমায়ের মৃত্যুর পর তার ভাই বিয়ে করে আনে।কিন্তু সে কিছুতেই কালীপদকে বাড়িতে থাকতে দেবে না কারণ কালীপদ তার বাড়িটা ছেলের নামেই করে দিয়েছিল অনেক আগেই।আজ তাকে ছেলে আর বউ মিলে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
 এখন শ্রেষ্টার বাবা তার কাছেই থাকে।যখন কালীপদ তার মেয়েকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তখন তার চোখ থেকে অবিরল ধারায় জল পড়ে।আর শ্রেষ্ঠার মন এক শান্ত ,সুশীতল, অনিবর্চনীয় সুখানুভূতি লাভ করে।


 

No comments:

Post a Comment