ঋণ (ছোট গল্প)
নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী
অফিস থেকে ফিরতে সেদিন খুব রাত হয়েছিল, হরতাল, রেলঅবরোধ;শেষ ট্রেনের যাত্রী হয়ে যখন সুশান্তবাবু ষ্টেশনে পৌঁছান তখন ছোট ছোট গুমটিগুলি বন্ধ হয়ে গেছে।চারিদিকে একটা শ্মশানের নিস্তব্ধতা।কিছু কুকুর শুধু অবিরাম ডেকে চলেছে।তিনি বাড়ির পথে পা বাড়ান।হঠাৎ তার নজরে পড়ে ষ্টেশন চত্বরেই একজন ভিখারীনী শুয়ে আছে আর একটি বাচ্চা তার বুকের উপর পড়ে মাতৃদুগ্ধ পান করে চলেছে, তাদেরকে ঘিরেই কুকুরগুলোর চিৎকার।একটু অবাক হলেন সুশান্তবাবু।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ান।তখন তিনি অদ্ভুত একটি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।কয়েকটি সারমেয় এসে তার পথ আগলে দাঁড়ায় ও চিৎকার করে ডাকতে থাকে।তিনি বুঝতে পারেন তারা তাকে কিছু বলতে চায়।তিনি আবার ওই ভীখারীনীর কাছে এগিয়ে যান।অদ্ভুতভাবে সারমেয়গুলিও তাকে অনুসরণ করে।তিনি মহিলার কাছে এসে মা,মা করে বেশ কয়েকবার ডাকেন কিন্তু সাড়া না পাওয়াতে নীচু হয়ে মহিলাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠানোর চেষ্টা করেন।সেটাও নিস্ফল হয়।অদ্ভুতভাবে কুকুরগুলোর ডাক বন্ধ হয়ে যায়।কিন্তু ওখান থেকে তারা নড়েনা।তিনি মহিলার হাতটি ধরে নাড়ির স্পন্দন বুঝতে চেষ্টা করেন।মহিলা যে বেঁচে নেই এটা বুঝতে তার একটুও অসুবিধা হয়না আর সারমেয়গুলি এটা বুঝতে পেরেই এত রাতে বাচ্চাটিকে পাহারা দিতেই এখানে জড়ো হয়েছে।মানুষের মধ্যে আজ যে মনুষত্ব হারিয়েছে তা বুঝি আজ পশুদের মধ্যে প্রবলভাবে জেগে উঠেছে।দু, আড়াই বছরের ছেলেটিকে কোলে তুলে তিনি মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন।
(2)
স্বামীর মৃত্যুর পর সরলাদেবী বড় সন্তান অয়নের কাছেই থেকে যান।বড়ছেলে অর্নব চাকরীর সুবাদে দিল্লীতে থাকে।সারাটাদিন বড় বৌমার নানান কটুক্তি আর ফারফরমায়েশ পালন করতে করতেই দিন গুজরান করা।নীরবে চোখের জল মোছা ছাড়া অন্য কোন উপায় তিনি খুঁজে পাননা।হঠাৎ করেই একদিন ছোট ছেলে অর্নব এসে মাকে তার কাছে নিয়ে যেতে চায়।ছোট ছেলে রাজি হলেও বড় বৌমা বেঁকে বসে।সে তার দেওরকে পরিস্কার করেই বলে যে মায়ের মোটা পেনশনের লোভে সে মাকে নিতে এসেছে।অর্নব হেসে পরে বলে,"কালই মায়ের পেনশনেরর এটিএম কার্ডের ব্যবস্থা করবে।ডাকযোগে কার্ডটা আসলে তুমি প্রতিমাসে টাকাটা তুলে নিও।তাহলে তো কোন আপত্তি নেই তোমার?
( 3)
ছোট ছেলের বাড়িতে পৌঁছে ড্রয়িংরুমে ঢুকেই স্বামীর বড় করে বাঁধানো একটি ছবি দেখতে পাআর ঠিক তার পাশেই দুই ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর একটি পুরান ছবি।অনেক পুরনো স্মৃতি চোখের সামনে ভিড় করে দাঁড়ায়।এই ছেলেকে বুকে চেপে অত রাতে যখন স্বামী বাড়িতে আসেন তখন উদার মনের পরিচয় সেদিন সরলাদেবী দিতে পারেননি।কিন্তু অনেক বুঝিয়ে সুশান্তবাবু সেদিন তাকে রাজি করিয়েছিলেন।তিনি এও বলেছিলেন, "আমি যখন থাকবনা দেখবে এই ছেলেই একদিন তোমায় মাথায় করে রাখবে।"পরবর্তীতে যদিও তিনি কখনোই দুই ছেলেকে আলাদা চোখে দেখেননি তবুও তার মধ্যে একটা কিন্তু থেকেই গেছে।অর্নব পিছন থেকে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, "কাঁদছো কেন মা?দাদার জন্য কষ্ট হচ্ছে?তুমি মাঝে মাঝে দাদার কাছে যেও কিন্তু বলে দিচ্ছি বেশিদিন থাকতে পারবেনা।তুমি আমায় পেটে ধরনী বলে আমাকে ছেড়ে তুমি শুধু দাদার কাছে থাকবে এটা হবেনা" সরলাদেবী কেঁপে ওঠেন!যা কেউ কোনদিন জানেনা তা তুই কি করে জানলি ?এই জন্য আমরা বাড়ি বিক্রি করে ভাড়াবাড়িতে যেয়ে উঠেছিলাম।"ছোটবৌমা চা, জল খাবার নিয়ে ঢোকে।"একি তুমি একাই মার আদর খাচ্ছো?আমি কি বানের জলে ভেসে এসেছি মা?"আবদারের সুরে নীতা কথাগুলি বলে।সরলাদেবী হাত বাড়িয়ে নীতাকে বুকে টেনে নেন।একটু পরেই অর্নবের কাছে জানতে চান,"কি করে জানলি বললিনা?" "বাবা মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে আমাকে একটা ডায়রী দেন আর বলেন তিনি যখন থাকবেন না তখন যেন আমি ডাইরিটা পড়ি।ভুলেই গেছিলাম।কয়েকদিন আগে ডাইরিটা চোখে পরে আর ওটা পরেই আমার মনেহল আমার মাকে আমি আমার নিজের কাছেই রাখবো।তিনি জগৎজননী ।এই মাকে এতদিন আমি কাছছাড়া করে রেখেছিলাম ? তোমার একটাই কাজ এখানে রোজ আমাকে সেই আগের মত আদর করা আর অন্যায় করলে শাষন করা।" নীতা চিৎকার করে উঠলো, "মা তোমার এই আদরের মধ্যে যেন আমি আর তোমার ছোট্ট নাতনীটাও পড়ি" দুহাত দিয়ে চোখ মুছে খাট থেকে নাতনীকে বুকে জড়িয়ে ধরেন সরলাদেবী।
#নন্দা
নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী
অফিস থেকে ফিরতে সেদিন খুব রাত হয়েছিল, হরতাল, রেলঅবরোধ;শেষ ট্রেনের যাত্রী হয়ে যখন সুশান্তবাবু ষ্টেশনে পৌঁছান তখন ছোট ছোট গুমটিগুলি বন্ধ হয়ে গেছে।চারিদিকে একটা শ্মশানের নিস্তব্ধতা।কিছু কুকুর শুধু অবিরাম ডেকে চলেছে।তিনি বাড়ির পথে পা বাড়ান।হঠাৎ তার নজরে পড়ে ষ্টেশন চত্বরেই একজন ভিখারীনী শুয়ে আছে আর একটি বাচ্চা তার বুকের উপর পড়ে মাতৃদুগ্ধ পান করে চলেছে, তাদেরকে ঘিরেই কুকুরগুলোর চিৎকার।একটু অবাক হলেন সুশান্তবাবু।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ান।তখন তিনি অদ্ভুত একটি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।কয়েকটি সারমেয় এসে তার পথ আগলে দাঁড়ায় ও চিৎকার করে ডাকতে থাকে।তিনি বুঝতে পারেন তারা তাকে কিছু বলতে চায়।তিনি আবার ওই ভীখারীনীর কাছে এগিয়ে যান।অদ্ভুতভাবে সারমেয়গুলিও তাকে অনুসরণ করে।তিনি মহিলার কাছে এসে মা,মা করে বেশ কয়েকবার ডাকেন কিন্তু সাড়া না পাওয়াতে নীচু হয়ে মহিলাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠানোর চেষ্টা করেন।সেটাও নিস্ফল হয়।অদ্ভুতভাবে কুকুরগুলোর ডাক বন্ধ হয়ে যায়।কিন্তু ওখান থেকে তারা নড়েনা।তিনি মহিলার হাতটি ধরে নাড়ির স্পন্দন বুঝতে চেষ্টা করেন।মহিলা যে বেঁচে নেই এটা বুঝতে তার একটুও অসুবিধা হয়না আর সারমেয়গুলি এটা বুঝতে পেরেই এত রাতে বাচ্চাটিকে পাহারা দিতেই এখানে জড়ো হয়েছে।মানুষের মধ্যে আজ যে মনুষত্ব হারিয়েছে তা বুঝি আজ পশুদের মধ্যে প্রবলভাবে জেগে উঠেছে।দু, আড়াই বছরের ছেলেটিকে কোলে তুলে তিনি মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন।
(2)
স্বামীর মৃত্যুর পর সরলাদেবী বড় সন্তান অয়নের কাছেই থেকে যান।বড়ছেলে অর্নব চাকরীর সুবাদে দিল্লীতে থাকে।সারাটাদিন বড় বৌমার নানান কটুক্তি আর ফারফরমায়েশ পালন করতে করতেই দিন গুজরান করা।নীরবে চোখের জল মোছা ছাড়া অন্য কোন উপায় তিনি খুঁজে পাননা।হঠাৎ করেই একদিন ছোট ছেলে অর্নব এসে মাকে তার কাছে নিয়ে যেতে চায়।ছোট ছেলে রাজি হলেও বড় বৌমা বেঁকে বসে।সে তার দেওরকে পরিস্কার করেই বলে যে মায়ের মোটা পেনশনের লোভে সে মাকে নিতে এসেছে।অর্নব হেসে পরে বলে,"কালই মায়ের পেনশনেরর এটিএম কার্ডের ব্যবস্থা করবে।ডাকযোগে কার্ডটা আসলে তুমি প্রতিমাসে টাকাটা তুলে নিও।তাহলে তো কোন আপত্তি নেই তোমার?
( 3)
ছোট ছেলের বাড়িতে পৌঁছে ড্রয়িংরুমে ঢুকেই স্বামীর বড় করে বাঁধানো একটি ছবি দেখতে পাআর ঠিক তার পাশেই দুই ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর একটি পুরান ছবি।অনেক পুরনো স্মৃতি চোখের সামনে ভিড় করে দাঁড়ায়।এই ছেলেকে বুকে চেপে অত রাতে যখন স্বামী বাড়িতে আসেন তখন উদার মনের পরিচয় সেদিন সরলাদেবী দিতে পারেননি।কিন্তু অনেক বুঝিয়ে সুশান্তবাবু সেদিন তাকে রাজি করিয়েছিলেন।তিনি এও বলেছিলেন, "আমি যখন থাকবনা দেখবে এই ছেলেই একদিন তোমায় মাথায় করে রাখবে।"পরবর্তীতে যদিও তিনি কখনোই দুই ছেলেকে আলাদা চোখে দেখেননি তবুও তার মধ্যে একটা কিন্তু থেকেই গেছে।অর্নব পিছন থেকে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, "কাঁদছো কেন মা?দাদার জন্য কষ্ট হচ্ছে?তুমি মাঝে মাঝে দাদার কাছে যেও কিন্তু বলে দিচ্ছি বেশিদিন থাকতে পারবেনা।তুমি আমায় পেটে ধরনী বলে আমাকে ছেড়ে তুমি শুধু দাদার কাছে থাকবে এটা হবেনা" সরলাদেবী কেঁপে ওঠেন!যা কেউ কোনদিন জানেনা তা তুই কি করে জানলি ?এই জন্য আমরা বাড়ি বিক্রি করে ভাড়াবাড়িতে যেয়ে উঠেছিলাম।"ছোটবৌমা চা, জল খাবার নিয়ে ঢোকে।"একি তুমি একাই মার আদর খাচ্ছো?আমি কি বানের জলে ভেসে এসেছি মা?"আবদারের সুরে নীতা কথাগুলি বলে।সরলাদেবী হাত বাড়িয়ে নীতাকে বুকে টেনে নেন।একটু পরেই অর্নবের কাছে জানতে চান,"কি করে জানলি বললিনা?" "বাবা মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে আমাকে একটা ডায়রী দেন আর বলেন তিনি যখন থাকবেন না তখন যেন আমি ডাইরিটা পড়ি।ভুলেই গেছিলাম।কয়েকদিন আগে ডাইরিটা চোখে পরে আর ওটা পরেই আমার মনেহল আমার মাকে আমি আমার নিজের কাছেই রাখবো।তিনি জগৎজননী ।এই মাকে এতদিন আমি কাছছাড়া করে রেখেছিলাম ? তোমার একটাই কাজ এখানে রোজ আমাকে সেই আগের মত আদর করা আর অন্যায় করলে শাষন করা।" নীতা চিৎকার করে উঠলো, "মা তোমার এই আদরের মধ্যে যেন আমি আর তোমার ছোট্ট নাতনীটাও পড়ি" দুহাত দিয়ে চোখ মুছে খাট থেকে নাতনীকে বুকে জড়িয়ে ধরেন সরলাদেবী।
#নন্দা
No comments:
Post a Comment